চিকিৎসকের কর্মস্থল শান্তিগঞ্জ, সেবা দিচ্ছেন ঢাকায়
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার হাজার হাজার মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসা ‘পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র’। প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ১০০ জন রোগী এখানে সেবা নিতে আসেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের অদ্ভুত এক সিদ্ধান্তের কারণে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয়রা। কাগজ-কলমে চিকিৎসক থাকলেও বাস্তবে তিনি সেবা দিচ্ছেন ঢাকায়, আর বেতন তুলছেন সুনামগঞ্জের এই কেন্দ্র থেকে।
নিয়ম অনুযায়ী এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রে দুজন মেডিকেল অফিসার ও একজন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার থাকার কথা। তবে বহু বছর ধরে কোনো মেডিকেল অফিসার নেই। দীর্ঘদিনের এই সংকট নিরসনে গত ৬ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপনে জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার শাহেদুল আলম ভূঁইয়াকে পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পদায়ন করা হয়।
তবে একই আদেশে তাঁকে ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ‘সংযুক্তি’ দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়—সংযুক্তিকালীন তিনি মূল কর্মস্থল (পশ্চিম পাগলা উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র) থেকেই বেতন-ভাতা উত্তোলন করবেন।
বর্তমানে কেন্দ্রটি চলছে একমাত্র উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার হুমায়ুন কবিরকে দিয়ে। জনবল সংকট, ওষুধের স্বল্পতা এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পুরো প্রতিষ্ঠানটির বেহাল দশা। চিকিৎসক পদায়নের খবরে স্বস্তি ফিরলেও, তাঁকে ঢাকায় পদায়ন করায় স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জগলুল হায়দার বলেন, “একজন চিকিৎসককে আমাদের কেন্দ্রে পদায়ন দেখিয়ে ঢাকায় পাঠানো চরম বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত। যেখানে আমাদের চিকিৎসক প্রয়োজন, সেখানে কাগজে-কলমে পদায়ন দেখিয়ে অন্যত্র সংযুক্তি দেওয়া আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না। আমরা অবিলম্বে তাঁকে মূল কর্মস্থলে ফেরানোর দাবি জানাচ্ছি।”
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দা আনছার উদ্দিন বলেন, “আমাদের হাসপাতালের বেতন-ভাতা নিয়ে একজন চিকিৎসক ঢাকায় সেবা দেবেন—এটা হতে পারে না। দীর্ঘদিন চিকিৎসক না থাকায় এলাকার মানুষ ভোগান্তিতে ছিলেন, আর এখন পদের সুবিধা নিয়ে ঢাকায় সেবা দেওয়া হচ্ছে। এটি হাওরবাসীর সঙ্গে স্পষ্ট বৈষম্য।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইকবাল হাসান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী এই সংযুক্তি দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকের অভাবে রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ায় বিষয়টি সিভিল সার্জনকে জানানো হয়েছে।”
অন্যদিকে সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিন জানান, জেলায় এমনিতেই তীব্র জনবল সংকট। তার ওপর এ ধরনের ‘সংযুক্তি’ প্রথার কারণে সংকট আরও জটিল হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “সংযুক্তি প্রথার ফলে কাগজে-কলমে পদ খালি না থাকায় নতুন কোনো চিকিৎসকও আনা যাচ্ছে না, আবার স্থানীয়রাও সেবা পাচ্ছেন না। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে লিখিত ও মৌখিকভাবে কথা বলা হয়েছে। আমরা পদায়নকৃত চিকিৎসককে দ্রুত মূল কর্মস্থলে পাঠানো এবং এই ক্ষতিকর সংযুক্তি প্রথা বাতিলের অনুরোধ জানিয়েছি।”
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: