নীলকান্ত এর গুচ্ছ কবিতা ‘বিধ্বস্ত বাগানের ভাস্কর্য ও অন্যান্য’
ছন্দহীন কবিতা
*
হৃদয়ে ক্ষত মেরামতের কাজ চলছে;
ভেতরে উঁকি দেওয়া মানা—
এমনকি আড়চোখে দেখাও কঠোর নিষেধ।
সেই কবে তোমাকে শেষবার দেখেছিলাম—
তারপর থেকে আজ অবধি দেখ আমি কতটা একা!
আমার চারপাশ জুড়ে সবাই ছিল শুধু তুমিই নেই
চারদিকে এখন কেবল শূন্যতার এক তীব্র চিৎকার
ওরা আসলে আমার হয়ে তোমার জন্যই কাঁদছে।
তুমি চলে গেলে আমাকে একা ফেলে
আমাদের যে এক চিলতে স্বপ্নের সংসার ছিল—
তা আজ ভেঙেচুরে কেবলি এক কল্পনার ধ্বংসাবশেষ।
বেদনার এই তীব্র প্রহরে ভাঙা হৃদয় এখনও
কবিতা বুনে তোমাকে ঘিরে—নিঃসঙ্গ, ছন্দহীন কবিতা।
বিদায়
*
সবাই শেষ অবধি চলেই যায়—
কেউ কারো জন্য নোঙর ফেলে মায়ায় বাঁচে না।
নিয়তির অমোঘ নিয়মে একদিন আমিও চলে যাব—
ওই সুদূর নীহারিকার গহীনে—যেখানে নক্ষত্রদের
ভাঙা হাড় আর আলোর কঙ্কাল। সেখানে একাকীত্বের
একেকটি ধূসর রেখায় জ্বেলে রাখব আমার বিষণ্ণ
সময়ের উপাসনা। মহাবিশ্বের সেই নিস্তব্ধতায়—
আমি থাকব একা আর স্মৃতিতে থাকবে তুমি
অথবা আমি নেমে যেতে পারি সমুদ্রের অতল গহীনে
যেখানে আলো পৌঁছায় না শুধু জমা হয় পৃথিবীর ক্লান্তি।
ডুবে যেতে যেতে হয়তো একদিন ভেসে উঠব তরঙ্গে;
আমার সেই চিতার ভস্ম মন তখন বাতাসে সুবাস ছড়াবে
হয়ত অভিমানে পৃথিবীর সব ফুলেরা ঝরে যাবে সেদিন
তবুও অক্ষত থেকে যাবে আমার জীর্ণ হাতে লেখা তোমার নাম।
কোনো কৃত্রিম সান্ত্বনা দিতে চাই না
প্রকৃতির বুক জুড়ে এখন কেবলি বন্ধ্যা অন্ধকার
তাই আজ তোমার ক্যানভাসেও এত কালো রঙ
আমার চেনা সেই শান্ত মানুষটি আজ বন্দুকের নলে শান্তি খোঁজে
বারুদের গন্ধ আর যুদ্ধই বুঝি এখন তোমার শান্তির নিঃশ্বাস—
আমি তবে চললাম এই রণক্ষেত্র ছেড়ে—
জানি না কোন অসীমের দিকে যাচ্ছি তবে এটুকু জানি—
পেছনে ফেলে যাচ্ছি তোমার অবয়ব। বিদায় প্রিয়—
যুদ্ধের এই কোলাহলে ভালো থেকো।
বিধ্বস্ত বাগানের ভাস্কর্য
*
ভিনগ্রহে বিধ্বস্ত কোনো বাগানের একাকী ভাস্কর্যের মতো—
আমিও নিজেকে ধ্বংস করছি প্রতিনিয়ত।
তোমার কপালের লাল টিপ রোজ সন্ধ্যায় আমার আকাশে অস্ত যায়,
আর আমি পড়ে থাকি এক অতল অন্ধকারে।
অভিমানী আমি নিয়ম করে ডাকিনি তোমায় কখনো;
তাই আজ অন্য কারও কোলে ফোটে তোমার বিশ্বাসের মাথা।
বুকের চেনা ওই কৃষ্ণতিল—
আজ গোপনে তাকেই দেখাও
জানি, হঠাৎ কোনোদিন আমায় সামনে দেখলে—
অন্ধ হয়ে যাবে তীব্র অপরাধবোধে
আর বোবার মতো আমিও তখন একাই দাঁড়িয়ে থাকব।
বাগানে তো মৌমাছিরা আসে একদম নিয়ম মেনে
তারা জানে কোন ফুলে কতখানি মধু লুকিয়ে আছে।
সেই মধু পানের পর মৌমাছিরা ঠিকই ফিরে যায় তাদের রানীর কাছে
আর ফুলেরা! তারা কী তবে কেবলি ঝুলে থাকে শয়তানের গলে?
নাকি অবহেলায় ফুল এভাবেই পচে যায় আস্তাকুঁড়ে!
পৃথিবীর সব আয়োজনেই আসলে একটা নিয়মিত স্বার্থ থাকে
মালিও তো বাগানে জল দেয় কেবলি নিজের প্রয়োজনে।
সবাই শেষে নিজের হিসাব চুকিয়ে ঘুমাতে যায়
শুধু এক অন্তহীন রাত জেগে থাকে আমার এই পরিশ্রান্ত দুচোখ।
হাট বসেছে হাট
*
চারদিকে এখন বসেছে এক অদ্ভুত হাট;
পিঁপড়ের পাখা গজিয়েছে বিনাশের লোভে,
তাই আজ আমিও কিনতে যাব এক পশলা মৃত্যু।
এই হাটে জীবন বিসর্জন দিয়ে কিনতে হয় মরণের স্বাদ
মৃত্যু এখানে হরেক রঙের ছদ্মবেশে ঘোরে জীবনকে গ্রাস করতে।
আজ এক অবোধ শিশুও লাইনে দাঁড়িয়েছে মৃত্যু কিনবে বলে
তাই তো তার নিথর শরীর ভিজে আছে তাজা রক্তলালে
এখানে মৃত্যু বিক্রি হয় কাফন ছাড়াই
আর তাই বুঝি মায়ের পবিত্র শরীরটা আজ পিশাচের আহার?
এই হাটে মরণ কিনতে পারে না সবাই
মৃত্যুর চড়া দাম মেটাতে দিতে হবে তোমার সর্বস্ব;
তবুও তোমার চেয়ে যার হাত বেশি রক্তাক্ত আর ক্ষমতাবান
দিনশেষে মরণের রাজকীয় অধিকার হবে শুধু তারই।
আর তাই তো এক কোণে পড়ে থাকা ওই কঙ্কালসার মানুষটি কাঁদছে—
সে বড্ড গরিব, কবে পাবে সে একটুখানি কাঙ্খিত মৃত্যুর স্বাদ!
প্রথম সিলেট সাহিত্য ডেস্ক
মন্তব্য করুন: