কোম্পানীগঞ্জে মদকের ভয়াল বিস্তার,মহাসড়কেই বসে মাদকের হাট

প্রতিবাদ করলেই হুমকি

কোম্পানীগঞ্জে মদকের ভয়াল বিস্তার,মহাসড়কেই বসে মাদকের হাট

নিজস্ব প্রতিনিধি,কোম্পানীগঞ্জ

০৫/০৭/২০২৬ ২১:১৯:২৩

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা কোম্পানীগঞ্জে মাদকের বিস্তার ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ভারতের সীমান্ত গলিয়ে অবাধে আসছে ফেনসিডিল, ইয়াবা, হুইস্কিসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিদেশি মদ। স্থানীয় একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, কয়েকটি সুসংগঠিত চক্র এই মাদক চোরাচালানের সাথে জড়িত। সীমান্ত দিয়ে আনা এসব মাদক উপজেলার বর্নী, গৌরিনগর, খাগাইল, টুকের বাজার, বউবাজার ও পাড়ুয়া মহাসড়ক সংলগ্ন এলাকায় দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। এমনকি মাদক ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও এই চালান সরবরাহ করছে। অনুসন্ধান ও বিশ্বস্ত সূত্রে মাদক কারবারে জড়িত প্রায় শতাধিক ব্যক্তির একটি তালিকাও এসেছে গণমাধ্যমের হাতে।


সম্প্রতি উপজেলার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র ‘উৎমা ছড়া’র একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এতে দেখা যায়, দিনে-দুপুরেই পর্যটকদের হাতে মাদক তুলে দেওয়া হচ্ছে। এই ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মাদকসেবীদের আনাগোনা বাড়ায় সন্ধ্যা নামতেই সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ মহাসড়কের কয়েকটি স্থানে রীতিমতো মাদকের হাট বসে বলে জানান স্থানীয়রা।


মাদক ও চোরাচালান চক্রের সাথে ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নূর আহমদের অনৈতিক যোগসাজশ ও ‘মামলা বাণিজ্যে’র অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। সম্প্রতি কিছু চোরাচালানের মালামাল আটককে কেন্দ্র করে আলী হোসেন নামের এক যুবক অভিযোগ করেন, জেলা যুবদল নেতা ফরহাদ হোসেনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নির্দোষ ব্যক্তিদের মামলায় আসামি করার মূল কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা।


তবে সামাজিক স্তরে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধও গড়ে উঠছে। বৃহত্তর ভোলাগঞ্জ, পাড়ুয়া ও টুকের বাজার এলাকার যুবসমাজ মাদক কারবারিদের ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়াসহ নানামুখী সামাজিক আন্দোলন ও সভা-সমাবেশ শুরু করেছে। কিন্তু এই সামাজিক আন্দোলনের বিপরীতে মাদক ব্যবসায়ীরা প্রতিবাদকারীদের প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে ভোলাগঞ্জ আদর্শ গ্রামের মোফাজ্জল হোসেন রাজু কয়েকজন মাদক কারবারির নাম উল্লেখ করে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।


সরেজমিনে গোপন অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাদক সিন্ডিকেটের অনেক সদস্যই একাধিক মামলার আসামি এবং জেল খেটে বের হয়ে আবারও একই পেশায় জড়িয়ে পড়ছে। গণমাধ্যমের হাতে আসা ১০০ জনের তালিকায় বিভিন্ন এলাকার মূল হোতাদের নাম উঠে এসেছে। তারা হলেন, বর্নী ও খাগাইল মহাসড়ক এলাকার তাজ উদ্দিন, শেখ উদ্দিন, সামসুল, জসীম, জিয়া, দুলালসহ অন্তত ২৪ জন। বউ বাজার ও টুকের বাজার এলাকার হাশিম, কাদির, রুবেল, রহিম, রিফাতসহ ১৩ জন। পাড়ুয়া ও ভোলাগঞ্জ আদর্শ গ্রাম: কালা, দুলাল, আজিম, কলসুমা, রফিক, সানুর, রাজন, মিলন, আফতাব, কাউসার, বতু মিয়া, শুকুর, জুবের, হেলাল, আনু মিয়াসহ ২১ জন। উৎমা সীমান্ত এলাকার শাহীন, হেলাল, তাজ উদ্দিন, ইল্লাল, মোস্তফা, আজাদ, দেলোয়ার, ফরমানসহ ২২ জন। দয়ার বাজার এলাকার রুফেজ, হামিদ, জাবেদসহ ১৩ জন ও ছনবাড়ী এলাকার আশিক, তেরাব, ইলিয়াস, দানাই, রাবুসহ ৮ জন।


গত ২৯ জুন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় মাদক ও চোরাচালান পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বের সাথে আলোচনা হয়। সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রবিন মিয়া মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধে সীমান্ত এলাকায় বিজিবি’র টহল জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেন এবং জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ দেন।


এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ইউএনও মোহাম্মদ রবিন মিয়া সভাটির সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করে বলেন,মাদক কারবারিরা অনেক সময় অল্প দিনেই জেল-জরিমানা ভোগ করে ফিরে এসে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। আইনের শাসনকে আরও কঠোর করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিত ভূমিকা রাখতে হবে।


বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও স্থানীয় বাসিন্দা ড. জিয়াউর রহমান বলেন, বর্নী ও খাগাইল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদকের আগ্রাসন চলছে। আমরা সামাজিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার পরোক্ষ সহযোগিতার কারণে এটি পুরোপুরি নির্মূল করা যাচ্ছে না। প্রশাসন কঠোর না হলে শুধু সামাজিকভাবে এটি বন্ধ করা অসম্ভব।


উত্তর রণিখাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাস্টার ফয়জুর রহমান জানান, উৎমা, দমদমা ও বরমসিদ্দিপুর সীমান্ত দিয়ে আশঙ্কাজনক হারে মাদক ঢুকছে এবং স্থানীয় অনেক মানুষ এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে বিজিবি’র টহল বাড়ানো এবং কঠোর আইনি পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।"


সার্বিক বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শফিকুল ইসলাম খান প্রথম সিলেটকে জানান,পুলিশের নিয়মিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আর ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখে ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা (ক্রস) নেওয়া হয়েছে।

সোহেল রানা/ তাহির আহমদ

মন্তব্য করুন: