শিকড় থেকে বিলাত: প্রবাসেও সাহিত্য সাধনায় ব্রত সৈয়দ শাহনুর

শিকড় থেকে বিলাত: প্রবাসেও সাহিত্য সাধনায় ব্রত সৈয়দ শাহনুর

প্রীতম দাস, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

১৫/১০/২০২৬ ২০:৫৩:১৯

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

প্রবাস জীবনের ব্যস্ততা, ভিন্ন সংস্কৃতির পরিবেশ ও জীবনের বহুমাত্রিক বাস্তবতার মধ্যেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা অব্যাহত রেখেছেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সন্তান কবি, কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও গবেষক আহমেদ সৈয়দ শাহনুর। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি, কলাম ও গবেষণাধর্মী লেখালেখির মধ্য দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের সাহিত্যিক পরিচয়। যুক্তরাজ্যের লিডস শহরে বসবাস করলেও তাঁর সাহিত্যিক ভাবনার গভীরে রয়েছে জন্মভূমির স্মৃতি, মানুষের জীবনসংগ্রাম, সমাজবাস্তবতা এবং মাতৃভাষার প্রতি গভীর অনুরাগ।

সাহিত্য কেবল শব্দের বিন্যাস নয় এর মধ্য দিয়ে ধরা পড়ে মানুষের অন্তর্জগৎ, সমাজের চিত্র এবং সময়ের নানা সংকট ও সম্ভাবনা। আহমেদ সৈয়দ শাহনুরের সাহিত্যচর্চার মধ্যেও জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে ভাষায় প্রকাশ করার সেই প্রয়াস লক্ষ করা যায়। প্রবাসে অবস্থান করেও বাংলা ভাষায় তাঁর নিয়মিত সাহিত্যচর্চা মাতৃভাষার সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্কের পরিচয় বহন করে।

১৯৭০ সালে সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর (বুধরাইল) গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা প্রয়াত সৈয়দ খালিদ মিয়া এবং মা প্রয়াত সৈয়দা জমসী বিবি। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। শৈশব থেকেই বই পড়ার প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সব সময় পছন্দের বই কেনার সুযোগ না থাকলেও প্রতিবেশী ও বড়দের কাছ থেকে বই ধার করে পড়তেন। এই পাঠাভ্যাসই ধীরে ধীরে তাঁর চিন্তা, কল্পনা ও সাহিত্যবোধকে সমৃদ্ধ করে।

বিশ্বসাহিত্যের অমর নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়র, বাংলা সাহিত্যের দুই দিকপাল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম, কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকর্ম তাঁর পাঠজগৎকে প্রভাবিত করেছে। মানুষের মনস্তত্ত্ব, প্রেম-বিরহ, সামাজিক বৈষম্য, মানবিক সম্পর্ক ও জীবনের জটিলতাকে সাহিত্যের মাধ্যমে উপলব্ধি করার আগ্রহ তাঁর নিজস্ব লেখালেখির পথ নির্মাণে সহায়ক হয়েছে।

শিক্ষাজীবনে তিনি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মদন মোহন কলেজ থেকে স্নাতক (বিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের ক্যানটারবেরি ক্রাইস্ট চার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। শিক্ষা, পাঠাভ্যাস ও বিচিত্র জীবন-অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তাঁর চিন্তার জগৎ ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে।

আহমেদ সৈয়দ শাহনুরের সাহিত্যচর্চা কোনো একটি নির্দিষ্ট শাখায় সীমাবদ্ধ নয়। কবিতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস ও ভ্রমণসাহিত্যেও রয়েছে তাঁর পদচারণা। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ১৯টি। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ক্ষণিকের সুখ, প্রণয়ী হৃদয়, জন্মভূমি, জীবনের আয়না ও মাতৃভূমি। গল্পগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ধর্ষিত সমাজ, দুঃসময় ও লতায় লতায় পুষ্প। তাঁর উপন্যাস দিগন্তের পথে এবং ভ্রমণকাহিনি ইংল্যান্ড টু আলবেনিয়া তাঁর সাহিত্যকর্মের ভিন্ন ভিন্ন দিকের পরিচয় বহন করে।

কবিতায় অনুভূতি, প্রেম, স্বদেশচেতনা ও জীবনবোধকে প্রকাশ করার সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি গল্প ও উপন্যাসে ব্যক্তি, সমাজ ও সময়ের বহুমাত্রিক বাস্তবতা তুলে ধরার পরিসর তৈরি হয়। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় লেখালেখির মধ্য দিয়ে আহমেদ সৈয়দ শাহনুর সেই বহুমাত্রিক সৃজনশীলতারই চর্চা করে চলেছেন। অন্যদিকে, ভ্রমণকাহিনির মাধ্যমে ভিন্ন দেশ, সংস্কৃতি ও জনপদ সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার প্রয়াস লক্ষ করা যায়।

বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি ও আরাবি ভাষার প্রতিও তাঁর আগ্রহ রয়েছে। বিভিন্ন ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে জানার এই আগ্রহ তাঁর পাঠের পরিধি বিস্তৃত করেছে। ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে সাহিত্যকে বৃহত্তর পরিসরে উপলব্ধি করার আকাঙ্ক্ষা তাঁর সৃজনশীল পরিচয়ের আরেকটি দিক।

সাহিত্যিক অঙ্গনে তিনি জাতীয় কবিতা পরিষদের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমির সদস্যপদ লাভ করেন। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের ইনস্পায়ার নর্থ (Inspire North) সংস্থা থেকে প্রায় তিন বছর আগে তিনি একটি পুরস্কার লাভ করেন। এসব পরিচয় ও স্বীকৃতি তাঁর সাহিত্যিক জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

বর্তমানে যুক্তরাজ্যের লিডস শহরে বসবাসরত আহমেদ সৈয়দ শাহনুর প্রবাসজীবনের কর্মব্যস্ততার মধ্যেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট রেখেছেন। প্রবাস তাঁকে ভিন্ন সমাজ ও সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা দিয়েছে; অন্যদিকে জন্মভূমি, শৈশব ও মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগ তাঁর সাহিত্যিক অনুভূতিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র মাত্রা। দূরদেশে থেকেও নিজের ভাষায় লেখালেখি করার মধ্য দিয়ে তিনি স্বদেশের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাকে সৃজনশীলতার পরিসরে ধারণ করে চলেছেন।

জগন্নাথপুরের একটি গ্রামে শৈশবের বইপড়ার অভ্যাস থেকে শুরু হওয়া তাঁর সাহিত্যযাত্রা আজ যুক্তরাজ্যের প্রবাসজীবনেও অব্যাহত। এই দীর্ঘ পথচলায় রয়েছে পাঠের প্রতি নিষ্ঠা, লেখালেখির ধারাবাহিকতা এবং সাহিত্যকে জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রয়াস। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ, সাহিত্যিক কর্মকাণ্ড ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই যাত্রা প্রবাসে বাংলা ভাষার চর্চা ও বিকাশের বৃহত্তর ধারার সঙ্গে যুক্ত।

সাহিত্যিকের পরিচয় কেবল তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা কিংবা প্রাপ্ত সম্মাননায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁর রচনার বিষয়বৈচিত্র্য, জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এবং পাঠকের সঙ্গে সৃষ্টিকর্মের সংযোগও সেই পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আহমেদ সৈয়দ শাহনুরের সাহিত্যিক পথচলার মূল্যায়নও তাঁর রচনার নিবিড় পাঠ ও সমালোচনামূলক আলোচনার মধ্য দিয়ে আরও পূর্ণতা পাবে।

প্রবাসে থেকেও মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগ ধরে রাখা এবং বাংলা সাহিত্যের চর্চা অব্যাহত রাখা সহজ কাজ নয়। এই চর্চার মধ্য দিয়ে একজন লেখক একই সঙ্গে নিজের শিকড়কে ধারণ করেন এবং নতুন অভিজ্ঞতার আলোকে সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ পান। আহমেদ সৈয়দ শাহনুরের সাহিত্যিক অভিযাত্রা সেই নিরন্তর সাধনারই একটি উদাহরণ যেখানে জন্মভূমির স্মৃতি, জীবনের অভিজ্ঞতা ও বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা মিলেমিশে তৈরি করেছে তাঁর সৃজনশীল পথচলার স্বতন্ত্র পরিসর।

নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad