শ্রীমঙ্গলে রিসোর্টে গেস্টের গোপন ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ

শ্রীমঙ্গলে রিসোর্টে গেস্টের গোপন ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল

২৬/০৭/২০২৬ ২০:৪৯:৩৩

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় রিসোর্টের ভেতরে গোপনে গেস্টের ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ ওঠা সেই মেঘমালতি রিসোর্টের নাম ফেসবুক পেজে আকস্মিক পরিবর্তন করার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেটিজেন এবং স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক তোলপাড় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। 

এর আগে গত ৮ জুলাই উপজেলার রাধানগর এলাকায় অবস্থিত মেঘমালতি রিসোর্টে গোপনীয়তা নষ্ট করে আপত্তিকর ভিডিও-ছবি ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেন অপূর্ব সুত্রধর নামে এক তরুণ। এ সময় ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয়ভাবে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। শ্রীমঙ্গলের সার্বিক পর্যটন খাতের ভাবমূর্তি রক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দারা ও পর্যটন উদ্যোক্তারাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। শ্রীমঙ্গল রির্সোট মালিক সমিতিও প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনকে অনুরোধ করেন। 

তবে এ ঘটনায় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ পাল্টা চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছে। রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের বিরুদ্ধে ওঠা ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ ভিত্তিহীন। ঘটনার প্রায় ১৭ দিন পর অভিযুক্ত রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ অপরাধ ঢাকতে বা সমালোচনার মুখ থেকে বাঁচতে মেঘমালতি রিসোর্টের নাম পরিবর্তন করে বেলাশেষে রিসোর্ট নামকরণ করেছেন বলে দাবি সচেতনমহলের। 

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, গত ৮ জুলাই অপূর্ব সুত্রধর নামে মৌলভীবাজারের এক যুবক এক তরুণী  নিয়ে

মেঘমালতি রিসোর্টে যান। রিসোর্টে তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিলেও বাস্তবে প্রেমিক-প্রেমিকা ছিলেন। বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত রিসোর্টের একটি কক্ষে তারা অবস্থান করেন। রিসোর্ট ত্যাগ করার পর ওই তরুণের হোয়াটসঅ্যাপে আপত্তিকর ছবি দিয়ে টাকা দাবি করেন একজন। এমন অভিযোগ নিয়ে শহর থেকে কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে পরদিন রিসোর্টে যান তিনি। 

বিষয়টি নিয়ে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ ও তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে মারধরের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে স্থানীয় এলাকাবাসী ও প্রশাসনের লোকজন আসেন। এসময় ব্ল্যাকমেইলের শিকার তরুণ ও রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ প্রশাসনকে জানায় তারা এ বিষয়ে আইনের আশ্রয় নেবে। প্রশাসন সুত্রে জানা গেছে এ ঘটনায় রোববার (২৬ জুলাই) পর্যন্ত কোনো পক্ষই আইনের আশ্রয় নেয়নি।

এ বিষয়ে রাধানগর মাদক বিরোধী টিমের সদস্য হাফেজ আবুল হাসেনসহ স্থানীয় কয়েকজন বলেন, রিসোর্টে আগত গেস্ট ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েছেন এবং শহর থেকে লোকজন আসার খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে আসি। এখানে আসার পর ওই গেস্ট একটি নম্বর দেখিয়ে বলেছেন এই নম্বর থেকে তাকে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা দাবি করেছে। পরে আমরা খোঁজ নিয়ে দেখি নম্বরটি আমাদের এলাকার এক জনের। সে রিসোর্টে কাজ করে। এলাকার মুরব্বিরা তাকে শুক্রবার (১০ জুলাই) জুমার নামাজের পর আসার জন্য বলেন, সে ওইদিন কিন্তু আসেনি। বাস্তবে এখানে কী ঘটেছে তা বুঝতে পারছি না। একটা ছবি দেখানো হয়েছে তাও আবার অনেকেই এআই ছবি বলছেন। 

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী তরুণ অপূর্ব সুত্রধর বলেন, গত ৮ জুলাই মেঘ মালতি রিসোর্টে আমি একটি রুম বুকিং করি। আমার সঙ্গে একজন ছিল। বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ছিলাম। এখান থেকে আমরা যাওয়ার পর আপত্তির ভিডিও ও ছবি ধারণ করে আমাদের প্রাইভেসি নষ্ট করা হয়। পরে এগুলো আমার হোয়াটসঅ্যাপে দিয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা টাকা দাবি করা হয়। পরে আমরা সবাই রিসোর্টে যাই বিষয়টি সমাধান করার জন্য। তবে আমি তাদেরকে টাকা দেইনি। তখন তারা আমাদের সঙ্গে মারামারি শুরু করে দেয়। বিষয়টি নিয়ে যা ঘটেছে, সবাই দেখেছে। এ বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো সমাধান হয়নি। আমার দুজন আত্মীয় আছেন, তারা দেখতেছেন। প্রয়োজনে তারা কথা বলবেন। এই বিষয়ে কথা বলার মানসিকতা আমার নেই বলে তিনি জানান। 

মেঘমালতি রিসোর্টের ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গত ৯ জুলাই এক যুবক একটা স্ক্রিনশট দিয়ে বলছে রিসোর্ট থেকে তাকে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা চাচ্ছে। তখন আমি বলি আপনি রিসোর্টে আসেন বিষয়টি নিয়ে আমরা কথা বলি। পরে তারা রিসোর্টে এসে আমাদেরকে গালাগালি ও মারধর করে। একপর্যায়ে তারা আমাদের কাছেও তারা ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দাবি করে। তারা বলে ভিডিও দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে আমরা এই টাকা নিয়েছি। তখন আমরা বলি কার কাছে টাকা দিয়েছেন। পরে হাল্লাচিল্লা শুনে এলাকার মানুষ চলে আসেন। পরবর্তীতে সে আবার টাকা দেওয়ার কথা অস্বীকার করে। ঘটনার এক পর্যায় ট্যুরিস্ট পুলিশসহ প্রশাসনের লোকজন চলে আসেন। ছেলেটা রিসোর্টে থাকার জন্য মেয়েটাকে তার স্ত্রী পরিচয় দিয়েছে। পরে শোনা যায় মেয়েটি তার স্ত্রী নয়। আমরাতো কথার ওপর বিশ্বাস করেছি। আমরাতো আর কাবিননামা দেখতে পারি না। 

রিসোর্টের নাম পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি বাড়িতে চলে এসেছি। মালিক পক্ষ নাম পরিবর্তন করেছে মনে হয়। বিষয়টি আমি পুরোপুরি জানি না। 

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, নাম পরিবর্তন করে অপরাধ ঢাকা সম্ভব নয়। বরং এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থার পাশাপাশি রিসোর্টে সার্বিক নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। 

এ বিষয়ে রাধানগর ট্যুরিজম এন্ট্রাপ্রেনার অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি তাপস দাশ বলেন, এই ঘটনার পর আমরা উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়েছি। আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছি যথাযথভাবে বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বিষয়টি দেখা হবে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মামলা করার জন্য বলা হয়েছে। আমাদেরকে যে ছবিটি দেখানো হয়েছে, সেটি এই রিসোর্টের ওয়ালের কালারের সঙ্গে মিল নেই। আমাদের কাছে এআই ছবি মনে হয়েছে। 

শ্রীমঙ্গল আবাসন সেবা সংস্থার সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রির্সোটের মালেক সেলিম আহমেদ বলেন, যে রির্সোটে এই ঘটনাটি ঘটেছে সেটি আমাদের মূলধারার কোন রিসোর্ট নয়। তবুও যেভাবে প্রচার প্রচারণা হয়েছে এর প্রভার সামগ্রিক পর্যটনের জন্য কল্যাণকর নয়। স্থানীয় প্রশাসন ও সুশীল সমাজের উচিত এগুলো প্রতিরোধে এগিয়ে আসা।

বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট পুলিশের শ্রীমঙ্গল জোনে ওসি মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, এক ছেলে তার প্রেমিকা নিয়ে রিসোর্টে এসেছিল। তার দাবি আপত্তিকর ভিডিও করা হয়েছে।  সে বলেছে একটা স্ক্রিনশর্ট হোয়াটসঅ্যাপে দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা দাবি করা হয়েছে। আসলে স্ক্রিনশর্টের ছবিটি কতটুকু সত্য তা এখনও বোঝা যায়নি। আমরা ঘটনার দিন রিসোর্টে যাওয়ার পর এলাকার লোকজন নিয়ে বসে বিষয়টি সমাধান করে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে প্রয়োজনে উভয়পক্ষ মামলা করবেন। এখন কেউ যদি মামলা না করেন তাহলে কিছু করার নেই। 

শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, রিসোর্টের ঘটনায় লিখিত বা মৌখিক কেউ কোনো অভিযোগ করেননি। আমরা ওই ছেলের সঙ্গে কথা বলেছি, সে বলেছে তার কোনো অভিযোগ নেই। তাদের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছিল, সেটা সমাধান হয়েছে। রিসোর্টের নাম পরিবর্তন হয়েছে কি না সেটা আমার জানা নেই। 

এদিকে সচেতনমহল বলছেন, রিসোর্টে আলোচিত ঘটনাটি ভাইরাল হওয়ার পর আইনি পদক্ষেপ বা স্পষ্ট ব্যাখ্যার মুখোমুখি না হয়ে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ তাদের মূল ফেসবুক পেজটি প্রথমে ডিঅ্যাক্টিভ করে দেয়া এবং পরবর্তীতে ব্যবসা সচল রাখতে ওই রিসোর্টটির নাম পরিবর্তন করে নতুনভাবে প্রচারণা শুরু করা মানে অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা। এ ধরনের অপকর্ম শ্রীমঙ্গলের সার্বিক পর্যটন খাতের সুনামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। 

তাদের দাবি, পর্যটননগরী শ্রীমঙ্গলের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং ভ্রমণপিপাসুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনতিবিলম্বে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কোনো রিসোর্টে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে।

তাহির আহমদ/ মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad