বিশ্বম্ভরপুরের শতবর্ষী স্কুলে লাখ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

জ্যেষ্ঠ শিক্ষক টপকে জুনিয়রকে দায়িত্ব প্রদান

বিশ্বম্ভরপুরের শতবর্ষী স্কুলে লাখ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

প্রীতম দাস, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

১০/০৯/২০২৬ ২২:৩৩:৩৮

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

একসময় সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও সুপরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল ফতেপুর মুরারিচাঁদ উচ্চ বিদ্যালয়। শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়ে বছর কয়েক আগেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পরীক্ষার ফলাফল ছিল ঈর্ষণীয়। তবে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক হিসাব-নিকাশ নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।


বিদ্যালয়টির আর্থিক স্বচ্ছতা ও অনিয়ম নিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন স্থানীয় অভিভাবক মন্টু দাস। অভিযোগে বলা হয়, ২০২৫ সালে শিক্ষার্থীদের সেশন ফি বাবদ ৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা এবং ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন খাত থেকে ৭ লাখ ৪৪ হাজার ৫০০ টাকা আয় হয়। এছাড়া জমি ও অন্যান্য উৎস থেকে আরও ৩০ হাজার টাকাসহ সর্বমোট ১৪ লাখ ৬১ হাজার ৫০০ টাকা আয় হয়। কিন্তু বিপরীতে ব্যাংকে জমা দেখানো হয়েছে ২০২৫ সালে ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৬০ টাকা এবং ২০২৬ সালে ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকে জমার বাইরে থাকা অবশিষ্ট ৭ লাখ ৭২ হাজার ৪৪০ টাকার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না।


আর্থিক এই অনিয়মের পাশাপাশি জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের টপকে জুনিয়র ও ক্রীড়া শিক্ষক মোহাম্মদ আলী নূরকে কীভাবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হলো—তা নিয়েও বিতর্ক চরম আকার ধারণ করেছে। এমপিও নীতিমালা-২০২৫ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের প্রধান হস্তান্তরের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতার ক্রমানুসারে দায়িত্ব দেওয়ার বিধান থাকলেও তা মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।


বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক পবিত্র ভূষণ তালুকদার অভিযোগ করে বলেন, "শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রায় ৩৫ মাস ধরে ফান্ড থেকে তাঁদের প্রাপ্য বেসরকারি অংশের বেতন-ভাতা, বোনাস ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা পাচ্ছেন না। ২০২৩ সালের পর থেকে আমাদের আর কোনো অংশ পরিশোধ করা হয়নি।"


অভিযোগের বিষয়ে সহকারী শিক্ষক সঞ্জীবন রায় নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেন, "জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের বহাল রেখে নীতি লঙ্ঘন করে একজন জুনিয়রকে কেন দায়িত্ব দেওয়া হলো, তা খতিয়ে দেখা দরকার। পাশাপাশি ক্যাশবুক, শিক্ষার্থীদের বেতন রেজিস্টার ও ব্যাংক হিসাব মেলালেই আর্থিক অসঙ্গতি ধরা পড়বে।"


অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলী নূর। তাঁর দাবি, "আমার পূর্বে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক পবিত্র ভূষণ তালুকদার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন এবং অন্য এক শিক্ষক বরখাস্ত হওয়ায় তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটি আমাকে বৈধভাবেই দায়িত্ব প্রদান করেছে।"


তবে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সময়মতো বিদ্যালয়ে আসেন না এবং দুপুর ১টার পরই প্রায় দিন তাঁর কক্ষ বন্ধ পাওয়া যায়।


অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ইতোমধ্যে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জুলফিকার হোসেন। তিনি জানান, বিশ্বম্ভরপুরে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ খালি থাকায় সার্বিক তদারকিতে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে। তিনি বলেন, "অভিযোগের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে। শীঘ্রই এডহক কমিটি গঠন করে নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ম্যানেজিং কমিটি করা হবে এবং প্রধান শিক্ষকসহ এনটিআরসিএর মাধ্যমে ৬টি শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।"


শতবর্ষী এই বিদ্যাপীঠের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত সময়ের মধ্যে নথি নিরীক্ষা ও নিরপেক্ষ তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকার সাধারণ মানুষ।

নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad