প্রশাসন বদলায়, কিন্তু বদলায় না সিলেটের যানজট চিত্র

প্রশাসন বদলায়, কিন্তু বদলায় না সিলেটের যানজট চিত্র

দীপ্ত বৈষ্ণব

১০/০৯/২০২৬ ১৮:৪৭:৫৫

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সরকার বদলায়, প্রশাসনের কর্তারাও বদলি হন। কিন্তু বদলায় না সিলেট নগরীর চিরচেনা যানজটের রূপ। যত্রতত্র অবৈধ পার্কিং আর ফুটপাত দখল করে কথিত হকারদের পসরা সাজিয়ে বসা—সবই যেন নিত্যদিনের নিয়ম। এর মাঝে মাঝে নিয়মমাফিক অভিযানও চলে। হুইসেলের শব্দ আর পুলিশের সাইরেন বাজিয়ে যখন জেলা প্রশাসনের জিপ এসে পৌঁছায়, নিমেষেই বদলে যায় দৃশ্যপট। হকাররা ভ্যান ও পসরা নিয়ে গায়েব হয়ে যান পাশের গলিতে, উধাও হয়ে যায় অবৈধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলোও। আর অভিযান শেষ হলেই আবার যেখানকার জিনিস চলে আসে ঠিক সেখানে।

কয়েক বছর ধরে সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে এভাবেই চলছে যানজট ও ফুটপাত দখলের ‘ইঁদুর-বিড়াল’ খেলা। এ চিরচেনা ভোগান্তিকে সিলেটবাসী এখন যেন নিজেদের নিয়তি বলেই মেনে নিয়েছেন। কিন্তু এই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের দায় আসলে কার?

নগরীর শামীমাবাদের বাসিন্দা রাহুল সরকার (২৯) মোটরবাইক নিয়ে বাজার করতে এসেছিলেন জিন্দাবাজারে। তিনি বলেন, জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, কোর্ট পয়েন্ট, রিকাবীবাজার, চৌহাট্টা কিংবা আম্বরখানা—সব সড়কই যেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা আর রিকশার দখলেই থাকে।

ট্রেনে ঢাকা থেকে সিলেটে ফেরা মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের (৩২) অভিজ্ঞতায় উঠে এলো পর্যটন নগরীর করুণ চিত্র। জিন্দাবাজার থেকে চৌহাট্টাগামী সড়কের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘‘সকালে ফাঁকা থাকলে এই পথটুকু পার হতে ৫ মিনিট লাগে। কিন্তু বিকেলে লাগে কমপক্ষে আধা ঘণ্টা। ফুটপাত আর রাস্তা দখল তো আছেই। পুলিশের কাছে বললে বলে সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব, আর সিটি করপোরেশনে গেলে বলে জেলা প্রশাসনের। এভাবেই চলছে।’’

সমস্যা কেবল নগরীর ভেতরের কেন্দ্রবিন্দুতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রবেশমুখ হুমায়ুন রশীদ চত্বর, চণ্ডীপুল, বাবনা পয়েন্ট ও কদমতলীতে ভাঙাচোরা সড়ক ও যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করানোর কারণে তীব্র জ্যাম লেগেই থাকে। বিশেষ করে আধুনিক কদমতলী বাসস্ট্যান্ডের নির্ধারিত স্টপেজ ব্যবহার না করে চালকেরা মূল সড়কে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করান।

ব্যবসায়িক কাজে সপ্তাহে ৫-৬ দিন সিলেটে থাকা জকিগঞ্জের বাসিন্দা এম. এ. জব্বার (৬০) বলেন, ‘‘সরকার আসে-যায়, কর্মকর্তা বদলি হন; কিন্তু দীর্ঘ সারির যানজট আর মোড়গুলোর অচলাবস্থা একই থাকে। লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিলাসবহুল বাসস্ট্যান্ড তৈরি করা হলো, অথচ বাস এসে দাঁড়িয়ে থাকে মূল সড়কে। এগুলো দেখার কেউ নেই।’’

একই রকম দুর্বিষহ চিত্র দেখা যায় সন্ধ্যা নামার আগেই—মদিনা মার্কেট, সুবিদবাজার, নাইওরপুল, সোবহানীঘাট ও ইলেকট্রনিক সাপ্লাই রোডে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা শোভন মোদকের মতে, ‘‘অফিস টাইমে নিয়মিত এভাবে আটকে থাকা কাজের পরিবেশ নষ্ট করে। আমরা একটি সুপরিকল্পিত নগরী চাই।’’

নগরীর যানজটের বড় একটি কারণ বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা না থাকা। ধোপাদিঘীরপারের বাসিন্দা শিপন চন্দ দাস জয়ের মতে, জিন্দাবাজারের বেশ কিছু শপিং মল ছাড়াও সোবহানীঘাটের ইবনে সিনা হাসপাতাল কিংবা মীরবক্সটুলার মাউন্ট এডোরা হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে প্রতিনিয়ত হাজারো মানুষ আসেন। পার্কিং সুবিধা না থাকায় রোগী ও দর্শনার্থীদের গাড়ি পার্ক করা হয় সরাসরি প্রধান সড়কে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাবেক জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলমের আমলে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চলায় সাময়িকভাবে শৃঙ্খলা ফিরেছিল, কিন্তু সমন্বিত তদারকি না থাকায় তা আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে গেছে।

সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে সিলেট মেট্রোপলিটন ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার গৌতম দেব জানান, নগরীর ফুটপাত ও অর্ধেকের বেশি রাস্তা হকারদের দখলে থাকে। আর ফুটপাত মুক্ত করার মূল দায়িত্ব সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক)।

অন্যদিকে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক উপ-পুলিশ কমিশনার সুদীপ্ত রায় জানান, বর্তমানে ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অবৈধ স্ট্যান্ড ও ভুল পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত আইনি ব্যবস্থা ও অভিযান চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সিগন্যাল লাইট বসানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে এবং অবৈধ পার্কিং বন্ধে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে শুধুই মামলা বা অভিযান স্থায়ী সমাধান নয়, এর জন্য জনসচেতনতাও জরুরি।’’

দায়িত্ব কার—এমন প্রশ্নের জবাবে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘‘যানজট সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা সিসিকের কাজ না হলেও এটি নাগরিক সেবার অংশ। খুব শিগগিরই সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও পুলিশের যৌথ উদ্যোগে মোবাইল কোর্ট ও সমন্বিত অভিযান চালানো হবে। ফুটপাত উচ্ছেদ ও অবৈধ গাড়ি বাজেয়াপ্ত করার কাজ দ্রুতই দৃশ্যমান হবে।’’

প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের এমন প্রতিশ্রুতি বহুবার শুনেছেন সিলেটবাসী। তবে কাজের কাজ কতটুকু হবে, আর কবে মুক্ত বাতাসে স্বস্তিতে হাঁটতে পারবেন নাগরিকেরা—সেই প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।

আর আর

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad