বড়লেখায় আইন ভেঙ্গে বিয়ে পড়িয়ে প্রশ্নের মুখে নিকাহ রেজিস্ট্রার কাজী হুমায়ুন রশীদ
জাতীয় পরিচয়পত্রে হিন্দু ধর্মাবলম্বী, কিন্তু কাবিননামায় তিনি মুসলিম। শুধু তা-ই নয়, এফিডেভিট ও কাবিনের স্বাক্ষরেও দেখা গেছে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ। সরকারি নথি জালিয়াতি, নাম ও পরিচয় গোপন এবং নিকাহ রেজিস্ট্রেশন নীতিমালার তোয়াক্কা না করে তড়িঘড়ি বিয়ে নিবন্ধনের এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে মৌলভীবাজারের বড়লেখায়। এ বিষয়ে প্রথম সিলেটের হাতে এসেছে এক্সক্লুসিভ কিছু দাপ্তরিক নথি। তথ্য অনুযায়ী ১০নং দক্ষিণভাগ (দক্ষিণ) ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে আইনি বিধিমালা লঙ্ঘন ও অনৈতিক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে সহায়তার গুরুতর তথ্য উন্মোচিত হয়েছে।
প্রাপ্ত জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ও এফিডেভিট অনুযায়ী বরের নাম সুপ্রজিত কুমার দাস, পিতা: গোপেশ চন্দ্র দাস, মাতা: লক্ষ্মী রানী দাস। অথচ কোনো বৈধ সরকারি গেজেট প্রকাশ বা এনআইডি সংশোধন ছাড়াই কাবিননামায় বরের নাম লেখা হয়েছে "শাহরিয়ার শুভ"। সরকারি জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক সংশোধন ব্যতিরেকে কাবিনে সম্পূর্ণ কাল্পনিক নাম ব্যবহার করা সরাসরি এনআইডি আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং বড় ধরনের নথি জালিয়াতি।
নথিপত্র আরও গভীরে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এফিডেভিটের পাতায় বরের স্বহস্তে লেখা নাম ও স্বাক্ষর "সুপ্রজিত কুমার দাস" হলেও কাবিননামায় বর হিসেবে স্বাক্ষর করা হয়েছে "শাহরিয়ার শুভ" নামে। একই ব্যক্তির দুটি ভিন্ন সরকারি প্রক্রিয়ায় দুটি ভিন্ন নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা আইনি দৃষ্টিতে গুরুতর জালিয়াতি ও প্রতারণার শামিল। এছাড়া, বর ও কনে—উভয়েরই স্থায়ী বাসস্থান বড়লেখা পৌরসভা এলাকায় হওয়া সত্ত্বেও তারা নিজ এলাকার নিকাহ রেজিস্ট্রারকে এড়িয়ে ১০নং দক্ষিণভাগ (দক্ষিণ) ইউনিয়নের কাজীর কাছে যান। ‘মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯’ অনুযায়ী নিজ এখতিয়ারভুক্ত এলাকার বাইরে গিয়ে অন্য কাজীর মাধ্যমে বিয়ে রেজিস্ট্রি করা সম্পূর্ণ অবৈধ ও অনৈতিক।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি তথাকথিত নও-মুসলিম এফিডেভিট সম্পাদন করা হয় এবং ঠিক তার পরের দিন, অর্থাৎ ১৬ জানুয়ারি তড়িঘড়ি করে বিয়ে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করা হয়। ধর্ম পরিবর্তন, নাম সংশোধন ও আইনগত প্রক্রিয়ার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো সত্যতা যাচাই না করে এত দ্রুত সময়ে কীভাবে বিয়েটি নিবন্ধিত হলো, তা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অধিকন্তু, প্রথম সিলেটের হাতে আসা সুপ্রজিত কুমার দাসের একটি এক্সক্লুসিভ একটি ভিডিও বক্তব্যে তিনি নিজেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বী বলেই দাবি করেছেন, যা সম্পূর্ণ ঘটনাটিকে গভীর জালিয়াতির দিকে নির্দেশ করে।
এ বিষয়ে কাজী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর না দিয়ে কল কেটে দেন।
একজন সরকারি সনদপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রারের এমন অনিয়ম, এখতিয়ারবহির্ভূত সিদ্ধান্ত ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড ভুয়া কাবিনসহ নানা আইনি জটিলতা তৈরি করছে। এ অবস্থায় এনআইডি সংশোধন ছাড়া ভিন্ন নাম ব্যবহার, স্বাক্ষরের অমিল সত্ত্বে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করা এবং আঞ্চলিক এখতিয়ার লঙ্ঘনের বিষয়টি আমলে নিয়ে জেলা বিচারক, জেলা রেজিস্ট্রার ও আইন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ বিচারিক তদন্ত এবং অভিযুক্ত কাজীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো দাবি উঠেছে।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: