সুনামগঞ্জের ১৩ নদী পুনঃখনন প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে ফাইলবন্দি

একনেকে অনুমোদনের দাবি

সুনামগঞ্জের ১৩ নদী পুনঃখনন প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে ফাইলবন্দি

লতিফুর রহমান রাজু. সুনামগঞ্জ

১৩/০৯/২০২৬ ১৬:১৫:২০

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

প্রতি বছর বর্ষা ও আগাম বন্যায় পলি জমে সুনামগঞ্জের নদীগুলোর নাব্যতা এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জেলার কৃষি ও পরিবেশ ব্যবস্থার ওপর। বর্ষাকালে নদীগুলোর পানি ধারণক্ষমতা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই হাওরে দ্রুত পানি প্রবেশ করে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে, শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিচ্ছে তীব্র সেচ সংকট। হাওরাঞ্চলের কৃষকদের এমন বহুমুখী ও দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সুনামগঞ্জের ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ নদী পুনঃখননে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে। তবে দুই বছর পার হয়ে গেলেও অতি গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প প্রস্তাবটি এখনো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন না পেয়ে পরিকল্পনা কমিশনে ফাইলবন্দি হয়ে আছে।


নদীগুলোর পলি অপসারণ করে নাব্য নদীর প্রবাহ ফিরিয়ে আনা না গেলে সেচ সংকট, অসময়ে পানি প্রবেশ এবং পানি নিষ্কাশনজনিত সমস্যা আরও ভয়াবহ রূপ নেবে বলে মনে করছেন কৃষক ও হাওর সংশ্লিষ্টরা। বছরের পর বছর পলি জমে সুনামগঞ্জের বহু নদী সংকুচিত হয়ে গেছে। বর্ষা ও পাহাড়ি ঢলের সময় নদীতে পানির চাপ বাড়লে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে হাওরে দ্রুত পানি ঢোকে, আবার পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে মাসের পর মাস তৈরি হয় জলাবদ্ধতা। এতে বোরো চাষের জন্য জমি প্রস্তুত, সময়মতো চারা রোপণ এবং ফসল কাটার কাজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। এই বাস্তবতায় ২০২৪ সালে সুনামগঞ্জ পাউবো ১৩টি নদী পুনঃখননের উদ্যোগ নেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, এখনো প্রশাসনিক অনুমোদন না মেলায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। এতে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন হাওরাঞ্চলের লাখো বোরো চাষি।


গত বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে নদী ভরাটের কারণে ভয়াবহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়। স্থানীয়রা জানান, মহাসিং নদী পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় হাওরের পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশিত হতে পারেনি। ফসল রক্ষায় বাধ্য হয়ে স্থানীয়রা ‘উথারিয়া বাঁধ’ নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে এই বাঁধকে কেন্দ্র করে কৃষকদের মধ্যে দুই ধরনের মতভেদ তৈরি হয়। একপক্ষ জলাবদ্ধতা দূর করতে বাঁধ কেটে দেওয়ার দাবি তোলে, অন্যপক্ষ ফসল রক্ষার তাগে বাঁধ বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়। পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে একপর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসন হস্তক্ষেপ করে এবং বাঁধটি কেটে দেয়। তবে কৃষকদের অভিযোগ, বাঁধ কাটার আগেই জলাবদ্ধতার কারণে শত শত একর জমির কাঁচা ও আধাপাকা ধান পচে নষ্ট হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষোভ, জেলার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ মহাসিং নদীটি পাউবোর প্রস্তাবিত পুনঃখনন তালিকা থেকেও বাদ পড়েছে। হাওরবাসীর অভিজ্ঞতা, প্রতি বছর ফসলহানির পর স্লুইস গেট ও নদী খননের বিভিন্ন আশ্বাসের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার সুফল মেলে সামান্যই।


হাওরাঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশগত সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম ছদরুল। তিনি বলেন, পলি জমে মহাসিং নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় চলতি বোরো মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই দেখার হাওরে তৈরি হয় কৃত্রিম বন্যা। নদীতে পলি জমার পাশাপাশি পানির স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ করে অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট ও অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণই মূলত এই বিপর্যয়ের মূল কারণ। একমাত্র বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল এই অঞ্চলের মানুষকে বাঁচাতে নদী-নালা ও বিল পুনঃখননের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন।


একইভাবে দিরাই উপজেলার কৃষক ও 'হাওর মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন পরিষদ'-এর সদস্য সচিব এ কে কুদরত পাশা জানান, নদীর নাব্যতা না থাকায় হাওরের পানি দ্রুত নামতে পারে না। গত বছর জলাবদ্ধতায় বহু চাষি ফসল ঘরে তুলতে পারেননি। যে সামান্য ধান গোলায় তোলা গেছে, পানিতে ভেজায় সেগুলোর রঙ কালো হয়ে গেছে এবং খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এমনকি বাজারে সঠিক মূল্যও মিলছে না। নদীগুলো খনন হলে জলাবদ্ধতা কমার পাশাপাশি কৃষকের দুর্ভোগ অনেকটাই লাঘব হবে। জগন্নাথপুর উপজেলার কৃষক আলী আসগর ইমন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এক মৌসুমের ফসল নষ্ট হলে সেই ক্ষতি সামলাতে কৃষকের কয়েক বছর সময় লাগে। ফসল তোলার শেষ মুহূর্তে পানি ঢোকার যে অনিশ্চয়তা, তা মানুষকে কৃষিকাজ থেকে বিমুখ করছে। দ্রুত এই প্রকল্প অনুমোদনের জোরালো দাবি জানান তিনি।


নদী পুনঃখনন প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদুল হক জানান, আবুয়া, পাটলাই, সুরেশ্বরী, সুরমা নদীসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ ১৩টি নদী পুনঃখনন এবং দেখার হাওরে অত্যন্ত জরুরি স্লুইস গেট নির্মাণের প্রস্তাবটি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে চূড়ান্ত পর্যালোচনায় রয়েছে। বিষয়টি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী দু-একটি বৈঠকের পর প্রকল্পটি একনেকে চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে। অনুমোদন মিললে আসন্ন বোরো মৌসুমের আগেই বাস্তবে কাজ শুরু করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad