সিলেটের ১৩ বছরের কিশোরী শান্তি দত্ত যেভাবে হয়ে উঠেন কিংবদন্তি

সিলেটের ১৩ বছরের কিশোরী শান্তি দত্ত যেভাবে হয়ে উঠেন কিংবদন্তি

নীরব চাকলাদার

১৫/০৯/২০২৬ ১৯:৫৫:২৩

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

ইতিহাস শুধু সময়কে ধরে রাখে না; কিছু অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্বকে ধারণ করে অমর করে রাখে যুগ থেকে যুগে। সিলেটের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের মূলে যেসব সাহসী সন্তানের নাম সোনার অক্ষরে লেখা আছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম বিপ্লবের বহ্নিশিখা কমরেড শান্তি দত্ত। শতবর্ষের স্মৃতিধন্য ঐতিহ্যের প্রতীক কিশোরী মোহন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির মাত্র ১৩ বছর বয়সী সেই অদম্য ছাত্রীটি, যিনি একদা উত্তাল রাজপথে ব্রিটিশবিরোধী মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ঔপনিবেশিক শক্তির ভিত—তিনিই পরবর্তীতে হয়ে উঠেছিলেন এ দেশের প্রগতিশীল আন্দোলন ও মানবসেবার এক কিংবদন্তি পুরুষোত্তম রূপ।


১৯২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী মান্দারকান্দি গ্রামে এক প্রগতিশীল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শান্তি দত্ত (পারিবারিক নাম শান্তি ভট্টাচার্য)। তাঁর ভেতরের দ্রোহ ও রাজনৈতিক চেতনার স্ফুরণ ঘটেছিল কিশোরী মোহন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনাকালেই। ১৯৩৯ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে যখন সহপাঠীদের নিয়ে তিনি সিলেটের রাজপথে নেমেছিলেন, তখনই বিশ্ব চিনেছিল এই পুণ্যভূমির নারীদের অদম্য সাহস। তাঁর এই অকুতোভয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞার স্বীকৃতিস্বরূপ অতি অল্প বয়সেই তাঁকে তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রাথমিক সদস্যপদ দেওয়া হয়। এই বিদ্যাপীঠ থেকেই ১৯৪২ সালে তিনি প্রথম বিভাগে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাস করেন।


পরবর্তীতে তাঁর সমগ্ৰ জীবন রূপ নেয় সংগ্রাম, দেশপ্রেম ও নিঃস্বার্থ মানবসেবার এক জীবন্ত মহাকাব্যে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি ঐতিহাসিক মোড়েই তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। সংগ্রাম শুধুই রাজপথে সীমাবদ্ধ ছিল না; ১৯৪৩ সালে তাঁর প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডের ভয়ে ভীত হয়ে ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দা (CID) পুলিশ তাঁকে ও তাঁর ছোট বোন লক্ষ্মীকে গ্রেফতার করে সিলেট কারাগারে দুই মাস বন্দি রাখে। কিন্তু কারারুদ্ধ লোহার গরাদ তাঁর আদর্শিক তেজকে দমাতে পারেনি।


১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যখন পুরো দেশ অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়, তখন তিনি ভারতে গিয়ে শরণার্থী শিবিরগুলোতে ক্লান্তিহীন সেবায় নিজেকে সঁপে দেন। কেবল নেতৃত্ব দিয়েই ক্ষান্ত হননি, অসহায়, গৃহহারা ও ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য নিজ হাতে রান্না করে খাদ্য ও বস্ত্র পৌঁছে দিতেন তাঁবুতে তাঁবুতে।


স্বাধীনতার পর স্বাধীন বাংলাদেশেও থামেনি তাঁর এই কর্মযজ্ঞ। ১৯৭২ সালে ঢাকার মগবাজারে ছিন্নমূল ও বস্তিবাসী শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের আত্মনির্ভরশীল করতে গড়ে তোলেন সমবায় কার্যক্রম।


জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত শ্রমজীবী ও শোষিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তাঁর একমাত্র ব্রত। ২০০১ সালের ২২ ডিসেম্বর কলকাতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় জীবনাবসান ঘটে এই মহীয়সী নারীর।


কমরেড শান্তি দত্তের বিদ্যাপীঠ কিশোরী মোহন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় আজ স্মৃতির ডালপালা মেলে শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং নারী জাগরণ ও অদম্য সাহসের এক মহাকাব্যিক স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। আজকের উদীয়মান প্রজন্মের কাছে কমরেড শান্তি দত্তের জীবন কোনো সাধারণ অতীত ইতিহাস নয়—তা এক চিরন্তন উদ্দীপনা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার শিক্ষা এবং মানুষের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার এক অমর প্রেরণার নাম।

তাহির আহমদ/ মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad