ব্রিটিশ থেকে বাংলাদেশ: রাজনীতির আঁতুড়ঘর সিলেট
সিলেটের মাটি যেমন আধ্যাত্মিকতায় ধন্য, তেমনি এ মাটি বারবার প্রকম্পিত হয়েছে প্রখর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের পদচারণায়। ব্রিটিশ, পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশ—তিন আমলেই এই অঞ্চল জন্ম দিয়েছে বহু কিংবদন্তিতুল্য ও ত্রিকালদর্শী রাজনীতিবিদদের। পাহাড়-নদীর বাঁকে, সুরমা-কুশিয়ারার তটে বিকশিত হওয়া সিলেটের এই জননেতারা ছিলেন মেধা, প্রজ্ঞা ও আপোষহীন সংগ্রামের প্রতীক, যাঁরা বারবার বদলে দিয়েছেন উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র।
ব্রিটিশের আঁধার ভাঙতে এই অঞ্চলে জ্বলে উঠেছিল সাহসের মশাল। আসাম-বেঙ্গল রাজনীতিতে সিলেটকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন বিপিনচন্দ্র পাল, আব্দুল মতিন চৌধুরী, রাজা গিরিশচন্দ্র রায়ের মতো নেতারা। বিশেষ করে হবিগঞ্জের পৈল গ্রামে জন্ম নেওয়া বিপিন চন্দ্র পাল (১৮৫৮–১৯৩২) ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রখ্যাত চরমপন্থী নেতা এবং ইতিহাসপ্রসিদ্ধ 'লাল-বাল-পাল' ত্রয়ীর অন্যতম। কংগ্রেসের এই শীর্ষ নেতা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে 'স্বদেশী আন্দোলন' ও বয়কট আন্দোলনের ডাক দিয়ে পরাধীন ভারতে জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করেছিলেন।
একই সময়ে অবিভক্ত ভারতের আসাম প্রদেশের প্রভাবশালী নেতা আব্দুল মতিন চৌধুরী (যিনি ‘জিন্নাহর ডানহাত’ ও মাওলানা ভাসানীর প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিত ছিলেন) ১৯৩৩ সালে জিন্নাহর 'ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টি'র প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হন। আসামের কুখ্যাত 'লাইন প্রথা'র বিরুদ্ধে তাঁর বিপ্লবী ভূমিকা এবং ১৯৩৭ সালে আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা ইতিহাস হয়ে আছে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর যখনই বাঙালির অধিকার হরণ করা হয়েছে, তখনই গর্জে উঠেছে সিলেট। সিলেটের প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ ও ভাষা সংগ্রামী মাহমুদ আলী (১৯১৯–২০০৬) এবং দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ (১৯০৮–১৯৯৯) 'নওবেলাল' পত্রিকার মাধ্যমে প্রতিবাদের সুর তুলেছিলেন। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কথা বলায় দেওয়ান আজরফকে ১৯৫৪ সালে সুনামগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়, যিনি পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে জাতীয় অধ্যাপক হন।
ঐতিহাসিক ১৯৪৭ সালের সিলেট গণভোটে আসাম থেকে সিলেটকে পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন "কায়েদে সিলেট" খ্যাত আজমল আলী চৌধুরী। এছাড়াও এই গণভোটে সক্রিয় ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বসন্ত কুমার দাস (১৮৯৪-১৯৬৫) এবং সিলেট মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আবু আহমদ আব্দুল হাফিজ (১৯০০–১৯৮৫)। মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষায় তেভাগা আন্দোলনের প্রখ্যাত বামপন্থী নেতা বরুণ রায় (১৯২২–২০০৯) কৃষক ও শ্রমিকের জন্য প্রায় ১৪ বছর কারাবরণ করেছিলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও যুদ্ধপরবর্তী রাষ্ট্র গঠনে সিলেটের সন্তানরা অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি (বঙ্গবীর) জেনারেল মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী (১৯১৮–১৯৮৪) ১৯৭১ সালে সমগ্র যুদ্ধ পরিচালনার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্ষীয়ান নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ (১৯২২–২০০৫) ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক। প্রখ্যাত কূটনীতিক হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী (১৯২৮–২০০১) ১৯৭১ সালে লন্ডনে পাকিস্তানি গণহত্যার প্রতিবাদে পদত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বেসামরিক সংগঠক দেওয়ান ফরিদ গাজী ৪নং ও ৫নং সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। তিনি পরবর্তীতে শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও মেগা প্রকল্পের পরিকল্পনায় সিলেটের অর্থমন্ত্রীরা ছিলেন অনন্য। সাবেক অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান (১৯৩২–২০০৯) দীর্ঘ সময় সফলতার সাথে দেশের অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একইভাবে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত (১৯৩৪–২০২২) এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কূটনীতিবিদ ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া (১৯৩১–২০০৫) দেশের অর্থনীতিকে এক মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করান। সংসদীয় রাজনীতির ধারক হিসেবে বর্ষীয়ান পার্লমেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত (১৯৪৫–২০১৭) আমৃত্যু অবদান রেখে গেছেন।
রাজনীতির এই গৌরবোজ্জ্বল ধারা বংশপরম্পরায় ধরে রেখেছেন অনেকে। খান বাহাদুর দেওয়ান আবদুল হামিদ চৌধুরীর (আসাম বিধানসভার সদস্য) পুত্র দেওয়ান আব্দুল বাছিত চৌধুরী (১৯১১–১৯৮৮) ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী এবং তাঁরই উত্তরাধিকার হিসেবে বর্তমান সময়ের স্বতন্ত্র রাজনীতিবিদ দেওয়ান শামীম আফজল পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
ইতিহাসের পাতায় এই অঞ্চলের রাজনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন সৈয়দ হাদী, সৈয়দ মাহদী, ফজলুল হক সেলবর্ষী, লীলা দত্ত নাগ, অসিতরঞ্জন ভট্টাচার্য, কমরেড অজয় ভট্টাচার্য, হেনা দাস, মকবুল হোসেন চৌধুরী, সুন্দরীমোহন দাস ও সুহাসিনী দাসের মতো ক্ষণজন্মা মানুষেরা।
সিলেট মানেই কেবল চায়ের বাগান বা আধ্যাত্মিকতার পুণ্যভূমি নয়; অন্যায়ের বিরুদ্ধে সিলেটিদের ত্যাগ ও সংগ্রাম যুগে যুগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রকে করেছে সমৃদ্ধ ও অবিস্মরণীয়।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: