স্মরণ : অমিতাভ চক্রবর্তী
মুক্তির মন্দির সোপানো তলে...............
লোক জাগরণের স্বপ্ন দেখতেন তিনি । দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দর্শন ছিল তার চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ । অন্ধবিশ্বাস কুসংস্কার মুক্ত ছিলেন সর্বদা । বয়সে প্রবীণ চেতনায় নবীন এক শিল্পী । রাজপথে মিছিলে, মঞ্চের গানে ছিল তার সরব অংশগ্রহণ । তিনি গণসঙ্গীতশিল্পী অমিতাভ চক্রবর্তী ।
অমিতাভ চক্রবর্তী আজ আমাদের মাঝে নেই ।২০০৭ সালের ৩০ এপ্রিল সোমবার রাত তিনটায় তার সংগ্রামী জীবনের সমাপ্তি ঘটে । তবুও তার চলে যাওয়া অনেকে মেনে নিতে পারছেন না । কারণ আমাদের অনেকের অনুভবে তিনি এখনো জীবিত। কর্তব্যের ছক বাধা জীবনে সত্যেন অনুসারীরা তাকে স্মরণ করবেন শ্রদ্ধায় ।
অমিতাভ চক্রবর্তী দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে উদীচীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন । ১৯৭৮ সাল থেকে উদীচীর মঞ্চে তাঁর গান গাওয়া শুরু । মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত থেমে থাকেননি কখনো । সর্বশেষ ১৪ এপ্রিল ১৪১৪ বাংলার বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন এক স্বতস্ফুর্ত, স্বপ্রাণ ।
তার জীবন ছিল বর্ণাট্য। ৭ মার্চ ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত জেলা উদীচীর সম্মেলনে তিনি সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। ২৪ এপ্রিল ১৯৮৯ সালে অনুষ্ঠিত ৬ ষষ্ঠ জেলা সম্মেলনের আহ্বায়ক কমিটির সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন । এ সম্মেলনেও তিনি পুনর্বার সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন । ১৩৯৯ বাংলার ( ১৯৯২ ) সালের বর্ষবরণ ও বৈশাখী মেলার অনুষ্ঠান পরিচালনা সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন তিনি । ১৫ জানুয়ারি ১৯৯৩ সালে অনুষ্ঠিত সপ্তম জেলা সম্মেলনে তিনি সদস্য নির্বাচিত হন । ১৪০২ বাংলার বৈশাখী মেলার আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে উৎসব উদযাপনে ভূমিকা পালন করেন ।২১ মার্চ ১৯৯৭ সালের অষ্টম জেলা সম্মেলনে অমিতাভ চক্রবর্তী সিলেট জেলা উদীচীর সহ- সভাপতি নির্বাচিত হন । নবম জেলা সম্মেলনের অনুষ্ঠান উপ-পরিষদের দায়িত্ব কাঁধে নেন । ৩০ অক্টোবর ১৯৯৯ সালে অনুষ্ঠিত এ জেলা সম্মেলনে তিনি পূনবার সহ- সভাপতির দায়িত্ব পান । ১৪০৭ বাংলার (২০০০) সালের বর্ষবরণের আয়োজনে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন তিনি। পরের বছর ১৪০৮ সালের বর্ষবরণের অনুষ্ঠান উপ-পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তার কাজের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন । ১৫ মার্চ ২০০২ সালে অনুষ্ঠিত দশম জেলা সম্মেলনে তৃতীয়বারের মতো তিনি সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন । এ সম্মেলনেও তিনি সম্মেলনেও তিনি প্রস্তুতি পরিষদের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। মৃত্যুর পূর্ব সময় পর্যন্ত তিনি এ দু পদেই দায়িত্বে ছিলেন ।
এছাড়াও দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময় ধরে অমিতাভ চক্রবর্তী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে উদীচীর মঞ্চে গণ সঙ্গীত গেয়েছেন। আমৃত্যু তিনি ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক। তার মতো সংস্কৃতি সচেতন সংগঠক নতুন প্রজন্মের মাঝে সৃষ্টি হবে কিনা আজকের বাস্তবতায় এ প্রশ্ন খুবই প্রাসঙ্গিক।
দেশ ও জাতির সংকটে তিনি রাজপথে নামতেন ।বিশ্বাস করতেন সমাজতন্ত্র সাম্যবাদী মানব মুক্তির পথ। তাইতো বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাথে তার মতাদর্শগত সংযোগ ছিল নিবিড়। একটু রাগী স্বভাবের কারণে পার্টির কঠোর শৃঙ্খলার সাথে খাপ খাওয়াতে পারেননি। তাই সরাসরি পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করেননি তবুও আন্দোলন-সংগ্রামে বেশিরভাগ সময় উপস্থিত থাকতেন নিজ উদ্যোগে।
যশোরে উদীচীর সম্মেলনে বোমা হামলা থেকে শুরু করে পল্টন ছায়ানটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বোমা হামলার প্রতিবাদে তিনি রাজপথে সোচ্চার ছিলেন । জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে গান গেয়েছেন প্রতিবাদী কণ্ঠে । সংগ্রামের ডাক দিয়েছেন গানে গানে । গণসঙ্গীতের মধ্যদিয়ে জাগরিত করেছেন প্রাণ।
অত্যন্ত সহজ সরল ও সাদামাটা জীবন যাপনে অভ্যসত ছিলেন অমিতাভ চক্রবর্তী । আর্থিক টানাপোড়নের মধ্যেও বৈষয়িক লোভ তাকে মোহিত করতে পারেনি। ব্যবসাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করলেও অধিকাংশ সময় ব্যয় করতেন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে । পুরো পরিবারকেতিনি গড়ে তুলেছিলেন সেভাবে । সপরিবারে আসতেন উদীচিতে । মিছিলে শোভাযাত্রায় অংশ নিতেন ছেলেমেয়েকে নিয়ে । বড় ধরনের সংকটে স্ত্রীকেও নিয়ে আসতেন মিছিলে। সমাজ প্রগতির দীক্ষা দীক্ষা দিতেন । তারাও একই আদর্শের একীভূত ।
অমিতাভ চক্রবর্তী ছিলেন অগ্রসর চিন্তার মানুষ । ছাত্র ইউনিয়নের প্রতি তার দরদ ছিল অপরিসীম। পরম মমতায় ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীদের কাছে টেনে নিতেন। আর্থিক সহায়তা দিতে কার্পণ্য করতেন না কখনো । অন্যায় দেখলে জ্বলে উঠতেন অমিতাভ চক্রবর্তী ।বলতেন প্রয়োজন লৌহকঠিন বিপ্লবী সংগ্রামের ।আশায় বুক ভাবতেন একদিন তার কাঙখিত বিপ্লব সফল হবেই । তবু মাঝে মাঝে দুঃখ পেতেন স্বপ্নের বিকিকিনি দেখে। তারপরও দমে যাননি তিনি । দীর্ঘ মনোবলই যে ছিল তার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য।
সকল অশুভের বিরুদ্ধে মাঠে প্রান্তরে গান গেয়ে লোক জাগরণের সচেতন প্রচেষ্টা চালিয়েছেন অমিতাভ চক্রবর্তী । তার চলে যাওয়া মানেই শেষ নয় । সত্যেন সেনের উদীচী কর্মীরা পিলসুজ হয়ে জ্জ্বলে রইবেন বাংলার পথে প্রান্তরে । আর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হবে অমিতাভ চক্রবর্তীর গাওয়া গান মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হলো বলিদান লেখা আছে অশ্রুজলে অথবা কুহু কুহু ডাক শুনিয়া কাউয়ার পরান ফাইট্টা যায় কি মধুর বুলি মরে শুনাইলো কাউয়ায় ।
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: