সিলেটে বইমেলা ঠেকানো: সংস্কৃতির পথ রুদ্ধ কেন?
সিলেটে বইমেলা নতুন কিছু নয়। একুশের বইমেলা, স্বাধীনতা বইমেলা, মুক্তিযুদ্ধ বইমেলা—এলাকার ইতিহাস-ঐতিহ্য ঘিরে দশকের পর দশক ধরে নানা আয়োজনে যুক্ত থেকেছি আমরা অনেকে ব্যক্তিগতভাবে আমি পদক্ষেপ বইমেলার সঙ্গেও জড়িত ছিলাম। এতগুলো আয়োজনের একটিতেও কোনোদিন প্রশাসনিক বাধা বা রাজনৈতিক অভিযোগের দেয়াল সামনে পাইনি। তাহলে এখন হঠাৎ করে কেনো বইমেলা আয়োজন নিয়ে এত জটিলতা তৈরি হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সিলেটের বর্তমান সাংস্কৃতিক পরিবেশ, স্থানীয় রাজনীতির ভূমিকা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার নতুন বাস্তবতা—সবকিছুকে একসঙ্গে দেখতে হয়।
সিলেট প্রকাশক পরিষদ ২১টি ট্রেড লাইসেন্সধারী প্রকাশকের সমন্বয়ে গঠিত একটি সংগঠন। বয়সে নবীন হলেও এই সংগঠন ইতোমধ্যে লেখক তৈরি, আঞ্চলিক প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিজস্ব অবস্থান গড়ে তুলেছে। তাদের অনেক প্রকাশক জাতীয় পর্যায়ের একুশে গ্রন্থমেলায় অংশ নেয়। দেশ-বিদেশের লেখকদের বই প্রকাশ করে সুনাম কুড়াচ্ছে অনায়াসে।
সিলেটের প্রকাশনা জগতের শুরুর দিককার ইতিহাসও উল্লেখযোগ্য—বনসাই প্রকাশন ও একুশে বাংলা প্রকাশন দীর্ঘদিন সিলেটের নাম দেশের বাইরে তুলে ধরেছে। আমি নিজে একুশে বাংলা প্রকাশনার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আজও গর্ব করি, কারণ আমরাও আন্তর্জাতিক বইমেলায় অংশ নিয়েছিলাম, এবং অঞ্চলের সাহিত্যকে বৈশ্বিক মানচিত্রে জায়গা করে দেওয়ার জন্য কাজ করেছি। অথচ এখন সেই সিলেটেই প্রকাশকদের মেলা নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হচ্ছে। রাজনীতির গ্যারাকলে পিস্ট হচ্ছে অনন্য এক আয়োজন। যা সত্যিই বুদ্ধিহীনেরা বোঝার কথা নয়।
বইমেলার প্রস্তুতি ছিল অত্যন্ত ব্যাপক—মেট্রোপলিটনের মৌখিক অনুমতি, তদন্ত কর্মকর্তার ইতিবাচক প্রতিবেদন, এমনকি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পর্যায় থেকেও আশ্বাস। স্টল নির্মাণ, ফেস্টুন, প্রচারণা, মাইকিং—সব মিলিয়ে কাজ প্রায় শেষ ছিলো। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রকাশক পরিষদ, সিলট।
যতদূর জানা গেছে মেলা বাতিল করার পিছনে রয়েছে রাজনীতি নামক বিষপোড়া। ফলে স্বভাবতই প্রশ্ন হলো—একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন কি এখন এতটাই রাজনৈতিক সন্দেহের বিষয়ে পরিণত হয়েছে?
অরাজনৈতিক সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞ কেনো রাজনৈতিক চশমায় দেখা হচ্ছে? সিলেট প্রকাশক পরিষদ কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয়। তারা ব্যবসায়িকভাবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত প্রকাশক—যাদের কাজ বই প্রকাশ, লেখক তৈরি, সাহিত্যচর্চা ছড়িয়ে দেওয়া। যেসব লেখক বা গবেষককে রাষ্ট্র বা বড় প্রকাশনা সংস্থা কখনো বিবেচনায় নেয় না, তাদের বই এই প্রকাশকরাই প্রকাশ করে।
তবে কি এখন সংস্কৃতি, প্রকাশনা, বই—সবকিছুই রাজনৈতিক আনুগত্যের ঊর্ধ্বে থাকতে পারছে না?
সিলেটে বহু বড় বইমেলা হয়েছে, বহু সংগঠন এ আয়োজন করেছে। কখনো এমন প্রশ্ন, অভিযোগ বা বাধা সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের প্রবণতা মনে করিয়ে দিচ্ছে—সংস্কৃতি যেন ধীরে ধীরে সন্দেহের জায়গায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। অথচ সত্যি হলো যে, যে কোনো রাষ্ট্রের বা অঞ্চলের সংস্কৃতি সংকুচিত হলে সমাজও সংকুচিত হয়
একটি প্রকাশক সংগঠনের বইমেলা বন্ধ হওয়া শুধু একটি অনুষ্ঠান বাতিল নয়—এটি সৃজনশীলতার ওপর আস্থা কমিয়ে দেয়। লেখক, পাঠক, প্রকাশক—সবার মধ্যে ভয় ও সংশয় তৈরি করে। এবং সবচেয়ে বড় কথা, এটি একটি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বিকাশকেও থামিয়ে দেয়। সিলেটের সাহিত্য ও প্রকাশনার ঐতিহ্য সমৃদ্ধ। এখানে বহু ক্ষুদ্র প্রকাশক—অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও—নতুন লেখক তৈরি করেন, এলাকার কৃষ্টি-ঐতিহ্য নিয়ে বই ছাপেন। এই ধারাকে বাধা দেওয়া মানে ভবিষ্যতের সাহিত্যিক সম্ভাবনাকেই সংকুচিত করা।
বইমেলা কারো একার নয়—এটি একটি সমাজের বৌদ্ধিক শক্তির প্রতীক। অভিযোগের ভিত্তি দুর্বল হলে, সিদ্ধান্তও যৌক্তিক হয় না। সংস্কৃতির জায়গাকে সন্দেহ নয়—সমর্থন ও উৎসাহে শক্তিশালী করতে হয়। সিলেটে বইমেলা বন্ধ হওয়া সেই প্রশ্নই সামনে আনে: আমরা কি সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই, নাকি সন্দেহ-অভিযোগের জালে আটকে দিতে চাই?
লেখক: কানাডা প্রবাসী
প্রকাশক, একুশ বাঙলা প্রকাশন।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: