শাল্লায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় যুবদল নেতার নাম!

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষোভ

শাল্লায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় যুবদল নেতার নাম!

নিজস্ব প্রতিনিধি, শাল্লা

১১/০৬/২০২৬ ১৫:১৯:০৬

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তা কর্মসূচির উপকারভোগীর তালিকা প্রণয়নে ভয়াবহ অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকৃত ও নিঃস্ব কৃষকদের বাদ দিয়ে তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক এবং তার পরিবারের অন্তত ১২ থেকে ১৪ জন সদস্য। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় সাধারণ কৃষক ও সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। পুরো উপজেলা জুড়ে এখন এই নিয়ে তোলপাড় চলছে।


​ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি এই মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য ছিল প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু স্থানীয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে অকৃষকদের নাম তালিকায় ঢুকিয়েছে। এর ফলে সহায়তার মূল উদ্দেশ্য ভেস্তে গেছে এবং শত শত প্রকৃত কৃষক সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।


​অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাহাড়া ইউনিয়নের ঘুঙ্গিয়ারগাঁও গ্রামের বাসিন্দা এবং শাল্লা উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাকের নাম সরকারি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক তালিকার ১৫৫ নম্বর ক্রমিকে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। স্বজনপ্রীতির জাল এখানেই শেষ নয়; তালিকায় রাজ্জাকের আপন ভাই ব্যবসায়ী রফিক মিয়া ও ফারুক মিয়ার নামও রয়েছে। এছাড়া তালিকায় স্থান পেয়েছেন তার ভগ্নিপতি শান্তি মিয়া এবং মামুন মিয়া, রোমন মিয়া, সুমন মিয়া, উজ্জ্বল মিয়া ও সোহাগ মিয়াসহ মোট সাত ভাগনে।


​স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, তালিকায় স্থান পাওয়া আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারের এই সদস্যরা কেউই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত নন। তাদের একটি বড় অংশ শাল্লা সদরস্থ ঘুঙ্গিয়ারগাঁও বাজারের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং আর্থিকভাবে অত্যন্ত সচ্ছল।


​এই অনিয়মের ঘটনায় কেবল সাধারণ কৃষকই নন, ক্ষুব্ধ স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের একাংশও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাল্লা উপজেলা যুবদলের এক শীর্ষ নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে একটি মহল পরিকল্পিতভাবে এই অনিয়ম করছে। আমাদের শীর্ষ নেতা ও তার আত্মীয়স্বজনদের নাম তালিকায় দেখে আমরা নিজেরাও লজ্জিত ও অবাক। অথচ তারা কেউ কৃষক নন। দলের সুনাম নষ্ট করতেই এই ধরনের অপকৌশল নেওয়া হয়েছে, এর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার।


​তালিকা প্রণয়নের বিষয়ে জানতে চাইলে বাহারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ চৌধুরী নান্টু অনিয়মের কথা পরোক্ষভাবে স্বীকার করে বলেন, আমার জানামতে আব্দুর রাজ্জাক নিজে কখনো জমিজমা বা কৃষিকাজ করেন না, আমার চোখেও পড়েনি। উনার এক ভাই সাংবাদিক ফারুক জমি চাষ করেছেন, সেটা আমি দেখেছি।


​চেয়ারম্যান নিজের দায় এড়াতে গিয়ে আরও বলেন, আমি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েও এই তালিকায় একটি নামও সুপারিশ করিনি। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের মেম্বার ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দরাই এই তালিকা তৈরি, যাচাই-বাছাই ও সিলেকশন করেছেন। তারাই ভালো বলতে পারবেন।


​অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক তালিকায় নাম থাকার কথা স্বীকার করলেও অনিয়মের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তালিকায় নাম দেওয়ার সাথে আমার বা আমার পরিবারের কোনো সংশ্লিষ্টতা বা তদ্বির নেই। আমি নিজে সরাসরি কৃষিকাজ না করলেও আমাদের এলাকায় ৬০-৭০ কিয়ার (বিঘা) ফসলি জমি আছে, যেগুলো বর্গা বা অন্য উপায়ে চাষাবাদ করা হয়।


​এই বিষয়ে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, তালিকায় এই ধরনের অসংগতির বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তবে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তার তালিকা নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতি সহ্য করা হবে না। যদি কোনো অকৃষক বা প্রভাবশালীর নাম তালিকায় এসে থাকে, তবে স্থানীয়ভাবে পুনরায় কঠোর যাচাই-বাছাই করে তাদের নাম কেটে দেওয়া হবে এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা হবে।

তাহির আহমদ/ মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন: