প্রকৃতিপাঠে মেঠোসুরের ঋতুবীক্ষণ: শিশু-কিশোরদের মনন বিকাশে এক অনন্য প্রয়াস
প্রযুক্তির অতিরিক্ত নির্ভরতা আর যান্ত্রিক নগরায়ণের যুগে শিশু-কিশোরদের শৈশব যখন কেবল স্ক্রিন ও কৃত্রিম বিনোদনে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে, ঠিক তখন তাদের প্রাণবন্ত ও সংবেদনশীল করে তুলতে আয়োজন করা হলো ব্যতিক্রমধর্মী ‘ঋতুবীক্ষণ’ কর্মসূচি। সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘মেঠোসুর’-এর উদ্যোগে গত ২৪ জুলাই, শুক্রবার দিনব্যাপী বর্ষাঋতুকে উদযাপন করতে সিলেটে অনুষ্ঠিত হয় এই প্রাণবন্ত আয়োজন।
শিশু-কিশোরদের দেশীয় প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে সংগঠনটি প্রতিটি ঋতুতে এই ধরনের কর্মসূচি পালন করে থাকে।
এরই অংশ হিসেবে বর্ষার সজীব রূপকে ফুটিয়ে তুলতে সিলেটের বিভিন্ন এলাকার শিশু-কিশোর ও অভিভাবকদের নিয়ে প্রায় অর্ধশত মানুষের একটি দল দিনব্যাপী এই ভ্রমণে অংশ নেয়। কর্মসূচিটি শুরু হয় সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারে অবস্থিত ঐতিহাসিক হাছন রাজা জাদুঘর (মিউজিয়াম অব রাজাস) পরিদর্শনের মাধ্যমে।
এরপর অংশগ্রহণকারীরা সিলেটের নদী, হাওর, পাহাড় ও চা-বাগানের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথর পরিদর্শন করেন। মেঘালয়ের পাদদেশের স্বচ্ছ জলরাশি, চারপাশের সবুজ পাহাড় আর প্রকৃতির অপরূপ রূপ সুধা পান করে মুগ্ধ হয় শিশুরা। প্রকৃতির এই সান্নিধ্য তাদের মানসিক বিকাশে এবং বিনোদনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। সাদাপাথরের সুশীতল পরিবেশে গান গাওয়া, কবিতা আবৃত্তি ও একসঙ্গে দুপুরের খাবার খাওয়ার মধ্য দিয়ে দিনটি এক আনন্দঘন উৎসবে পরিণত হয়। ভ্রমণ শেষে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী রথমেলা ঘুরে এই বর্ণিল কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে।
বর্তমান যুগে মুঠোফোন ও প্রযুক্তির আসক্তিতে শিশু-কিশোরদের পারস্পরিক আত্মিক যোগাযোগ ও ঋতুবৈচিত্র্য উপভোগের সুযোগ দিন দিন কমে আসছে। বিশেষ করে যারা সচরাচর ঘুরতে যাওয়ার আর্থিক সুযোগ পায় না, এমন সুবিধাবঞ্চিত ও সাধারণ পরিবারের শিশু-কিশোরদের নিয়ে এ ধরনের আয়োজন তাদের মানসিক অবসাদ দূর করে এবং আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
অংশগ্রহণকারী কিশোর মাহী তার অনুভূতির কথা জানিয়ে বলে, ‘সংগঠনের মাধ্যমে এসে অনেক ভালো জায়গা দেখলাম, গান শুনলাম, কবিতা আবৃত্তি করলাম। সবাই মিলে একসাথে খাওয়া-দাওয়া করলাম, আমি অনেক খুশি।’
আরেক অভিভাবক জানান, টানাপোড়েনের সংসারে এই আয়োজন তাদের জীবনে এক সুন্দর মুহূর্ত এনে দিয়েছে, যেখানে সবাই এক পরিবারের মতো মিশে যাওয়ার সুযোগ পায়।
উদ্যোক্তা বিমান তালুকদার বলেন, ‘বাচ্চাদের হাসিখুশি ভাব দেখতে অপূর্ব লাগে। আনন্দপূর্ণ পরিবেশে তারা বড় হোক এবং দায়িত্ব নিতে শিখুক—এটাই আমাদের চাওয়া। প্রযুক্তির এই যুগে প্রকৃতির সাথে শিশুদের দূরত্ব কমাতে আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।’
অন্যতম সমন্বয়কের ভূমিকায় থাকা সিলেট হাছন রাজা জাদুঘর (মিউজিয়াম অব রাজাস)-এর সহকারী জাহাঙ্গীর আহমেদ বলেন, জাদুঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজের পাশাপাশি আমি মেঠোসুরে কাজ করে ভীষণ আনন্দ পাই। চিরায়ত বাংলার এক অনন্য মরমিকবি ও গীতিকার হাছন রাজার জীবনী আমাকে সহজিয়া পথে ধাবিত করে্। মনন ও সৃষ্টিশীল তাড়নাতেই মেঠোসুর পরিবারের একজন সদস্য হিসাবে বিভিন্ন সময় নানাবিধ কাজে যুক্ত থাকার চেষ্টা করি।
সাংবাদিক ও সগঠক দেবব্রত রায় দিপন বলেন, এ উদ্যোগ সত্যিই অনন্য। কয়েকটি ভ্রমণে আমি তাদের সঙ্গী হয়েছি| ভীষণ অসুস্থতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তবুও এইখানে আসলে আমি প্রাণ পাই। নবীন হয়ে উঠি। শুরুর দিকে এই কার্যক্রমের অতিথি থাকলেও এখন আমি নিয়মিত একজন কর্মীও।
আয়োজনটিকে আরও সাফল্যমণ্ডিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলেন ‘ঋতুবীক্ষণ’ কর্মসূচীর সভাপতি কাস্টমসে কর্মরত অঞ্জন সরকার| তিনি বলেন, সমাজের শিশু-কিশোরদের জন্য অনেক কিছু করার ইচ্ছে থাকলেও সময় সুযোগ হয়ে উঠে না| বিমান তালুকদার ও তার সঙ্গীদের সাথে সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে থাকার চেষ্টা করি। আরেকটু ভালো কিছু যদি করা যায়। সকলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় নিশ্চয়ই ভালো কিছু হবে। এই উদ্যোগে অংশগ্রহণকারী সকলকে তিনি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। ভবিষ্যতেও শিশু-কিশোর, শিক্ষার্থীদের জন্য এ ধরনের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
দিনভর নানা ভ্রমণ ও সাংস্কৃতিক আনন্দ শেষে অংশগ্রহণকারী শিশু-কিশোরদের হাতে বসন্ত বিশ্বাস পাঠাগার ও সংস্কৃতিজন ফয়েজ আহমেদের সৌজন্যে পুরস্কারস্বরূপ বই তুলে দেওয়া হয়।
আয়োজনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক ও সংগঠক দেবব্রত রায় দিপন, মুরাদ বকস, সংগঠক শাহজাহান উদ্দিন, মিনতি তালুকদার, জাহাঙ্গীর আহমেদ,সংগীতশিল্পী দীপালী তালুকদার, বাবুল আহমেদ ফাতাহ, ঝলক চৌধুরী, উদীচীকর্মী সন্দ্বীপ দেব, বিপ্লব বিহারী সরকার, বাদল দাস, জয়ন্ত দাস, সৌমিক দাস, দীপ দাস, অভিজিৎ দে, দিয়া তালুকদার দীপা, ইসমাইল ইসলাম, আলেয়া আক্তার, আকবর হোসেন, ওয়াদুদ ইসলাম, ওয়াফি, পিয়াল দাস, অরিত্র রায়, আন্নি দেব, সায়ান চক্রবর্তী, মুন দেব, আরতি দেব, রাধা রানী দেব, ইব্রাহিম আলী, আঁখি আক্তার, প্রমি দাস সুপ্রিয়া, সুজাতা দাস গুপ্ত, সম্পা তালুকদার, বাণীব্রত তালুকদার উল্লাস, ইমন দাস, তমাল দেব, ইচ্ছে দাস, ঈশান দাস, আনন্দ তালুকদার, ঈষাণ বনিক, অদ্রিজ তালুকদার, রত্না বাউরী, শীপন চাষা, আদি বাউরী, উজ্জ্বল বাউরী, অজিত সরকার প্রমুখ|সহ মেঠোসুর পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও সংগীতশিল্পীবৃন্দ।
সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিশু-কিশোরদের এই প্রকৃতিপাঠ ও বিনোদনমূলক আয়োজনটি এক সফল রূপ লাভ করে।
মীর্জা ইকবাল/ ডিডি
মন্তব্য করুন: