আয়েশা মুন্নি এর গুচ্ছ কবিতা ‘আয়না ও অন্যান্য’
আষাঢ়ের প্রার্থনা
*
আষাঢ় আসে, আকাশ খোলে দরজা
এক দেবালয়, যেখানে মেঘ ধূপের ধোঁয়া।
বিদ্যুতের ঝলক—আরতির শিখা জ্বলে
বৃষ্টি নামে, করুণার অমৃতধারা চলে।
ভালোবাসা বদলে যায় এই বর্ষায়
সৃষ্টি আর স্রষ্টার গোপন আলাপন হয়।
ভেজা মাটির গন্ধে মনে হয়
পৃথিবী তার আকাশকে ফিরে পায়।
মেঘ কাঁদে, আর সেই কান্না থেকে
জন্ম নেয় সবুজ, জন্ম নেয় অঙ্কুর।
হে কৃষ্ণকলি, তোমার কাজল চোখে
দুটি বর্ষার জানালা, যেখানে প্রেম প্রার্থনা লোকে।
কদম কেন শুধু বর্ষাতেই ফোটে?
জানে, প্রেমেরও এক ঋতু আছে—
যে ঋতুতে হৃদয় ফুলের চেয়ে বেশি ফোঁটে,
নদীর চেয়ে করুণা বহে, নীরবতা সত্য হয়।
ভালোবাসা মানে অধিকার নয়, অর্পণ
মেঘের মতো নিজেকে বৃষ্টি হয়ে বিলিয়ে দেওয়ার দর্শন।
আষাঢ় তাই শুধু বর্ষা নয়—
এক অন্তর্জাগরণ, এক অনন্ত আরতি।
যেখানে প্রতিটি বৃষ্টি এক মন্ত্র
প্রতিটি মেঘ এক প্রার্থনা
প্রতিটি কদম এক উপাসনা
ঈশ্বরের হৃদয় থেকে ঝরে পড়া অমৃত।
গহীন প্রজ্বলন
*
বুকের বাঁ পাশে জমিয়ে রাখা তীব্র ভালোবাসা তুমি বোঝেনি
তুমি দেখনি বিপণ্ণ বুকের নীরব দহন
দেখনি বুকের দগদগে ক্ষত বেয়ে রক্ত ঝরছে।
রক্তের ওমে ফুটেছে যে লাল গোলাপ
সেই ফুলের সৌন্দর্য দেখে তুমি অভিভূত হয়েছ।
কিন্তু কার্যকারণ জানতে চাওনি।
কর্ষিত বুকের পাঁজরের চাষাবাদ তুমি দেখনি
তুমি দেখেছ পাখির পালকে ঢাকা বাহ্যিক আবরণ।
তুমি নির্জন রাতে নক্ষত্রের গান শুনেছ
রাতের কানে বেজে ওঠা বিষন্ন বেহাগ তুমি শুনোনি।
তুমি জোনাকির আলোয় বিভোর হয়েছো
জানোনি জোনাকির বুকে গহীন প্রজ্বলন।
আয়না
*
আয়নায় যে প্রতিচ্ছবি দেখি, সুন্দর পরিপাটি। আয়নার পেছনে লুকিয়ে থাকা গল্পটা শুধু আমি জানি। একদিন আয়না প্রশ্ন করলো, তুমি কি সত্যিই সুখি? আমি নিজের গহীনে সত্য লুকিয়ে স্বভাবজাত সুরে বললাম, সুখ আপেক্ষিক। কিন্তু আয়না তো মিথ্যে বলে না, চুপচাপ দেখিয়ে দেয়। আমি কতটা বদলে গেছি! জীবনের ভার বইতে গিয়ে এখন আর পুরোপুরি লুকিয়ে রাখতে পারি না। চোখের সাজসজ্জার আড়ালে ক্লান্তি ধরা পড়ে। জীবন-ধারাপাতের নামতা গুনতে গুনতে কত অযুত নিযুত বার যে অশ্রু আড়াল করতে কাজল পরেছি এই আয়না তার রাজসাক্ষী। সবশেষ আয়না বলল, "নিজেকে ভালোবাসো" -- আমি হাসলাম কারণ চেষ্টা করছি প্রতিদিন!
প্রথম সিলেট সাহিত্য ডেস্ক
মন্তব্য করুন: