মাহিদুল ইসলাম -এর গুচ্ছ কবিতা ‘শীতঘুমে বসন্ত ও অন্যান্য’
শীতঘুমে বসন্ত
*
ধুলোর চাদর গায়ে সবুজ পাতারা
উপেক্ষা করছে রোদের উষ্ণতা,
অসীম শীতঘুমে মগ্ন সভ্যতায়
থেমে গেছে পাখিদের গান।
অপেক্ষায়—
কখন গলবে বরফ
তোমার চোখের কোণে,
কখন জমে থাকা অভিমান
নদী হয়ে বয়ে যাবে সমুদ্রের টানে।
এ অস্থায়ী শীত ফুরাবে একদিন
কুয়াশা সরলেই উঁকি দেবে সূর্য,
মৃতপ্রায় ডালেও ফোটবে পলাশ
শিমুল-বুকে ফুটবে রক্তিম বিস্ফোরণ।
বেওয়ারিশ
*
আমি কে!
আজও এই অনন্ত কুয়াশায় নিজেকেই খুঁজি।
আমি কি তবে জিবরাইলের ঝাপটানো ডানা
মহাশূন্যে খসে পড়া সেই অলৌকিক পালক!
নাকি ইসরাফিলের ধ্বংসবীণার
প্রলয়নাদে কাঁপতে থাকা প্রথম কম্পন
আমি কি সৃষ্টির গোপন ইশারা
নাকি মহাকালের অন্তিম হাহাকার।
আমি কে!
আজও নিজেকে হাতড়ে ফিরি
অ্যাপোলো-মন্দিরে, জিউসের নিঃসঙ্গ ঈগলের চোখে
কিংবা লঙ্কেশ্বরের দশম মস্তকের নিভৃত চিন্তায়!
আমি কি সেই ষোড়শীর জলভরা চোখের মণি
মরচে ধরা জানালার গ্রিলে হাত বাড়িয়ে
যে কাঁচের চুড়ি ভাঙে নীরব অভিমানে
রক্তাক্ত হয় অনন্ত প্রতীক্ষা!
আমি কি কোনও অসমাপ্ত যুদ্ধের ইতিহাস
যে নিজেকে খুঁজে বেড়ায়
কুরুক্ষেত্রের রক্তপিচ্ছিল ময়দান কিংবা
ওহুদ পাহাড়ের তপ্ত ধূলিকণায়
কারবালার বালুচরে তৃষ্ণার্ত ফোরাতের কান্না
নাকি ট্রয়ের ভস্মস্তূপের দীর্ঘশ্বাস
কোথায় আমার আসল পদচিহ্ন!
না, কোথাও খুঁজে পাইনি আজও নামপরিচয়।
শহরের নিয়নবাতির নিচে, অবহেলিত ফুটপাতে
ড্রেনের কালচে জল আর উচ্ছিষ্ট ময়লাস্তূপে
আমি আমাকে খুঁজি, কিন্তু পাই না!
আমি কি তবে ডোমঘরে পড়ে থাকা বেওয়ারিশ লাশ
নামহীন, গোত্রহীন আত্মা
নাকি নিজের কাটা মুণ্ডু হাতে
হেঁটে যাই যুগযুগান্তর।
আমি কি সেই অপরাজেয় তর্জনী
যার কালজয়ী বজ্রগর্জনে
সাড়ে সাত কোটি শৃঙ্খলিত হৃৎপিণ্ড
বিদ্রোহের রক্তলাভা ছড়ায় শিরা-উপশিরায়!
আমি কি তবে মহাকাব্যের শেষ নায়ক
রাজপথে মিশে থাকা ধূলিকণা
আমি কে!
মহাকালের আয়নায় নিজেকে খুঁজি
আজও!
পরবাসী দেওয়ান
উৎসর্গঃ দেওয়ান নাসের রাজা
*
বুকপকেটে বন্দি রেখে
ওসমান খানের গোপন খাম;
বিধবা ম্যাপল-তরুর
সঙ্গে দুঃখ ভাগে বিভোর।
হাওড়পারের সিক্ত হিজল
ডালপালায় জমে অভিমান;
আষাঢ়ের অশ্রুবারি
আজ বড়ো নোনা ঠেকে বুকে;
সঙ্গীহারা বিলাপে হঠাৎ
রক্তাক্ত ডাহুক-কণ্ঠস্বর।
১৭১ নম্বর স্ট্রিটে—
কাচ-কারাগারে বন্দি মেঘমালা;
অবসরে বিদ্যুৎরেখা
গুনে গুনে কেটে যায় প্রহর।
দূর স্বদেশের ধানিজমি
বুকে টেনে নেয় তীব্র বজ্রপাত;
ভরা ফসলি মাঠ আজ
ভাঙা বাঁধে চেয়ে করে আর্তনাদ;
বানের জলে ধুয়ে দিতে চায়
সকল পুঞ্জীভূত বেদনা।
দেওয়ান বাড়ির জরাজীর্ণ
টিনের চালে বৃষ্টির নূপুর;
আজও বুনে চলে অবিরত
অলংকৃত শব্দের মধুর সুর।
তেঘরিয়ায় অস্থির জমিন
পিপাসায় কাঁদে আজ আসমান;
কোন সুদূরে, কোন মোহে
আটকে বুক ভাসায় দেওয়ান!
চেরাপুঞ্জির বৃষ্টি
উৎসর্গঃ হেলাল চৌধুরী
*
পাহাড়ের বুকে শান্তির খোঁজে
ডাউকি নদীর ঘাট ছেড়ে
হেঁটে গেলে চেরাপুঞ্জির দিকে
মেঘ হয়ে পাহাড়ের বুকজুড়ে
অলস ঘুম ঘুম খেলা খেলে,
শঙ্খচিলের ডানায় খুঁজে ফেরো
ইলার সফেদ কায়া।
সেই পাহাড় শান্তি দিয়েছিল তোমায়!
নাকি সেখানেও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির ছলে
ঝরে পড়েছিল নোহ কা লিকাইয়ের
লাল টকটকে রক্ত?
ডাউকি নদীর স্বচ্ছ জলে
তোমার সেই ব্যথিত মুখ ভাসছে,
চেরাপুঞ্জির বাতাসে কাঁপছে
অভিশপ্ত মিথের করুণ কান্না।
লিকাই যেমন আত্মজার মাংস
হজম করেছিল অজান্তে
এই হিংস্র পৃথিবীও চিবিয়ে খাচ্ছে
তার নিজেরই সন্তান।
তুমি চেরাপুঞ্জির সাদা চিল হয়ে
উড়ে যাও সীমান্ত পেরিয়ে বহুদূর
ডাউকির শীতল জল মুছবে না কখনও
আমাদের এই যুগের মহাপাপ।
প্রথম সিলেট সাহিত্য ডেস্ক
মন্তব্য করুন: