আফজাল সুয়েব এর গুচ্ছ কবিতা ‘আত্মার প্রতিধ্বনি ও অন‍্যান‍্য’

আফজাল সুয়েব এর গুচ্ছ কবিতা ‘আত্মার প্রতিধ্বনি ও অন‍্যান‍্য’

প্রথম ডেস্ক

২৯/০৭/২০২৬ ০১:৫৫:৫১

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

ভিক্ষাবিস্ময়

*

আজ দেখলাম—

একটি ভিক্ষার থালা

শুধু ধাতুর গোল পাত্র নয়,

যেন একটি সংসারের উল্টে যাওয়া দুপুর।

তার ভেতর পড়ছিল

কয়েকটি মুদ্রার বদলে

মানুষের চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার শব্দ।

আমি দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম—

পকেটের চেয়ে বেশি শূন্য

নিজের ভেতর নিয়ে।

তারপর থেকে

ভিক্ষার থালাটা

আমার চোখের ভেতরেই পড়ে আছে।

মানুষটি হয়তো বাড়ি ফিরেছেন,

আমি এখনো ফিরতে পারিনি

সেই দৃশ্য থেকে।


আত্মার প্রতিধ্বনি 

*

ধূসর শূন্যতা নিজের নাম ভুলে যায়,

আমি সেখানে দাঁড়িয়ে থাকি—কোনো পরিচয় ছাড়া।

চোখের ভেতর ভাঙা আলোদের সংসার,

নীরব প্রশ্নেরা নিজেকেই খুঁজে ফেরে।

শেষ লাইনে নেই কোনো শেষ—শুধু অনন্তের ফাঁক।


মেঘের সাঁতার

*

ধানের শিষে আজও লেগে আছে

একটি নিঃসঙ্গ বিকেলের হলুদ রেণু।

পুকুরঘাটে রেখে আসা ছায়াগুলো

সারারাত জেগে জেগে

পানির কাছে শেখে ডুবে যাওয়ার প্রাচীন ব্যাকরণ।

একটি বক উড়ে গেলে

আকাশের গায়ে খুলে যায়

অন্য কোনো সময়ের গোপন দরজা।

আমি সেই দরজার ভেতর

শুনেছি মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকা বীজের কথোপকথন,

শুনেছি শ্যাওলার ভেতর আটকে পড়া

একটি বিলুপ্ত নদীর দীর্ঘশ্বাস।

দূরে কুয়াশা নয়—

কোনো এক ভুলে যাওয়া গ্রামের ধূপের ধোঁয়া

ভেসে ভেসে উঠছিল সময়ের কাঁধে।

তখন সন্ধ্যা তার জীর্ণ গামছা মেলে

জমা করছিল ঝরে পড়া নক্ষত্রের বালি।

আমি পথ হারাইনি,

মৃত্যুকুঞ্জে দেখে এলাম মেঘের সাঁতার।


কাগজের আয়নায় পৃথিবীর প্রতিবিম্ব

*

কাগজ নয়, যেন এক মন্ত্রপূত মুখোশ

যার পিঠে লেখা অদৃশ্য আইন—

যা দিয়ে ভাগ হয় ভাত, বাঁচা, মৃত্যু,

এবং সত্যেরও অধিকার।


সে আয়নায় মুখ নয়,

দেখি আগুনে পোড়া গ্রাম

আর শিশুর চোখে শুকনো নদী।

হাত তুলে বলি কিছু,

কিন্তু ঠোঁট থেকে ঝরে পড়ে নীরবতা।


একটা পাতলা পাতার ডানায় চড়ে

বুলেট পাড়ি দেয় সীমান্ত,

ঘুমন্ত শহরে পড়ে যায় অশ্রুর ছাই,

আর মায়ের বুক ফেটে যায়

এক অদৃশ্য গাণিতিক ভুলে।


সে চুম্বক হয়ে টেনে নেয়

চিকিৎসা, শিক্ষা, পানি—

আর ফিরিয়ে দেয় চকচকে এক মৌন প্রতিচ্ছবি,

যেখানে ন্যায়বিচার জুতো পালিশ করে।


একটি অন্ধ আয়নায়

বসানো হয় তাজা রক্তের ফ্রেম—

যেখানে ক্ষমতা দাঁড়িয়ে থাকে ঈশ্বরের বেশে,

আর প্রতিবাদ নেমে আসে হুইসেলধারী নিঃশ্বাসে।


সে আয়না প্রশ্ন করে না,

তবু তার দিকে তাকালেই

মানুষ নিজের হৃদয় বিক্রি করে

নতুন পরিচয়ে ফেরে—

একটি জন্মসনদহীন ছায়া হয়ে।


এই আয়নায় পৃথিবী যেন প্রতিদিন

নিজেকেই নিলামে তোলে—

প্রথম ডাক যায় জলবায়ুর,

শেষ ডাক যায় চিৎকারের।


রত্নার শ্বাসে গড়ে ওঠা দিন

*

কাদা রাস্তার শরীরে পা রেখে হেঁটে যাই,

ভোরের রোদ ভিজে থাকে আঙুলে আঙুলে,

পায়ের নিচে মাটি ডাকে—

ডাকে ফেলে আসা দিনের ছায়া।


রত্না নদী পাশ দিয়ে হাসে নীরবে,

কখনো সবুজ নীলচে, কখনো কেবলই অদৃশ্য ঢেউয়ের গন্ধ।

আমরা বইয়ের ব্যাগে ভিজে থাকা বর্ণমালা নিয়ে ভাসি,

হাওয়ার পিঠে বুনো হাসির মতো।


ডুবির হাওর খুলে রাখে তার স্তব্ধ জলঘর,

আলোর নিচে ডুবে যায় ঘাসের কান্না,

জলে দুলে ওঠে হারিয়ে যাওয়া শালুকের স্বপ্ন।

আমরা হাঁটি সেই জলরেখার মায়ায়—

জলে, মাটিতে, বাতাসে ঝুলে থাকা উন্মাদের মতো।


জামাই কাটা হাওর ওপারে মুখ গুঁজে কাঁদে,

তার জলে উড়ে যায় ছেঁড়া রৌদ্র,

ভাসে ভোরের অস্পষ্ট পাখি,

আর ডুবে থাকে হারিয়ে যাওয়া নামের ছায়া।


বর্ষায় উঠে আসে জল—

রাস্তা ডুবে ডুবে ওঠে হাঁটু, কোমর, কখনো বুক ছুঁয়ে।

আমরা সাঁতার কাটি শব্দহীন সুরের ভিতর,

পানির শরীরে আঁকি ভেজা বর্ণমালা,

আর হারিয়ে যাই ভোরের জলে গড়া কোনো অচেনা দেশে।


রত্নার ঢেউ ছুঁয়ে দেয় ভিজে স্বপ্নের ছায়া,

ডুবির নাভিমূলে ফুঁটে ওঠে নিঃশ্বাসের ফুল,

জামাই কাটার জলে গলে যায় ভুলে যাওয়া মুখ,

আকাশের বুক ভরে ওঠে রংধনু  ফুলের ঘ্রাণে।

প্রথম সিলেট সাহিত্য ডেস্ক

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad