তিন ড্রেজার জব্দ করে ‘মুচলেকায়’ মুক্তি: বিশ্বম্ভরপুরে প্রশাসন-পুলিশের ঠেলাঠেলি
সুনামগঞ্জের প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা ড্রেজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযানের পর এক অদ্ভুত নাটकीयতার জন্ম দিয়েছে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা প্রশাসন। নদী বিধ্বংসী অপরাধে ঘটনাস্থল থেকে তিনটি ড্রেজার মেশিন জব্দ করার পরও কোনো ধরনের মামলা না করে কেবল লিখিত ‘মুচলেকা’ নিয়ে অভিযুক্তদের জিম্মায় ড্রেজারগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার ঘটনায় পুরো সুনামগঞ্জ জুড়ে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, গত ২৩ জুলাই (বৃহস্পতিবার) বিকেল ৪টার দিকে উপজেলার মিয়ারচর এলাকায় যাদুকাটা নদীতে এক বিশেষ অভিযান চালায় বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা প্রশাসন। এ সময় নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তোলায় ব্যবহৃত তিনটি বড় ড্রেজার মেশিন জব্দ করা হয়। উদ্ধারকৃত আলামতের সাথে অপরাধের লিখিত দায় স্বীকারও পাওয়া যায়। জুয়েল মিয়া ও জাহের মিয়া নামের দুই ব্যক্তি প্রশাসনের সংরক্ষিত মুচলেকায় স্বীকার করেন তারা ‘বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’-এর ৪(গ) ধারা লঙ্ঘন করে অবৈধ বালু উত্তোলন করছিলেন। ভবিষ্যতে আর এমন অপরাধ করবেন না মর্মে লিখিত দেওয়ার পরই অলৌকিকভাবে মুক্তি পায় জব্দকৃত ড্রেজারগুলো।
কিন্তু দেশের প্রচলিত পরিবেশ ও পরিবেশ-সংক্রান্ত আইনে আলামত জব্দের পর মামলা না করে কেবল মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ কতটুকু তা নিয়ে সুশীল সমাজ ও আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দেখা দিয়েছে গভীর সংশয়।
ঘটনার দায় নিয়ে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় থানা পুলিশের মধ্যে প্রকাশ্য টানা হেঁচড়া লক্ষ করা গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজ্ সকিনা আক্তার বলেন, মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় সরাসরি অপরাধীদের না পাওয়ায় মামলা করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে জনপ্রতিনিধিদের তালিকা দিতে বলা হয়েছে এবং মুচলেকা দাতাদের নজরদারিতে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ড্রেজার হস্তান্তরের কারণ হিসেবে পুলিশি অনাগ্রহকে ইঙ্গিত দেয় প্রশাসন সূত্র।
তবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের এই বল ঠেলে দেওয়া অস্বীকার করেছেন বিশ্বম্ভরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহিন মিয়া। তিনি জোরালো কণ্ঠে বলেন, অভিযান ও জব্দ দুটোই করেছে উপজেলা প্রশাসন। এ বিষয়ে থাানাকে কোনো লিখিত দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। আমরা আলামত আটক করিনি, আটক করেছে প্রশাসন। ফলে মৌখিক কথায় দায় নেওয়ার সুযোগ নেই।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি এবং নদী ধ্বংসের মতো জামিন অযোগ্য অপরাধে সরাসরি আলামত (ড্রেজার) হাতেনাতে জব্দের পর কোনো পৃথক লিখিত আদেশ বা আদালতের নির্দেশ ছাড়া ফেরত দেওয়া বেআইনি এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় পরিবেশ কর্মীদের মতে, এমন শিথিল মনোভাবের কারণে যাদুকাটা নদী রক্ষায় সরকারের সব উদ্যোগ ভেস্তে যাচ্ছে। অপরাধীরা মুচলেকাকে এখন 'অফিসিয়াল ছাড়পত্র' বানিয়ে প্রতিনিয়ত নদী ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে চলেছে। বিষয়টিতে জেলা প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ দাবি করছেন সাধারণ মানুষ।
প্রীতম দাস/ ডিডি
মন্তব্য করুন: