সিলেট বিএনপিতে পুনর্গঠনের হাওয়া, দুই মন্ত্রীর বলয়ে পদ পাওয়ার লড়াই

সিলেট বিএনপিতে পুনর্গঠনের হাওয়া, দুই মন্ত্রীর বলয়ে পদ পাওয়ার লড়াই

আব্দুল হান্নান, নিজস্ব প্রতিবেদক

৩১/০৫/২০২৬ ০০:০৩:০৭

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও আগামী ডিসেম্বরে দলীয় কেন্দ্রীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে সিলেট বিভাগের বিএনপির সব ইউনিট ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে হাইকমান্ড। পবিত্র ঈদুল আজহার পর থেকেই এই সাংগঠনিক পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। মূলত তৃণমূলে দলকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করতেই কেন্দ্রের এই তোড়জোড়। তবে পুনর্গঠনের এই আবহের মধ্যেই সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ পদগুলো পেতে স্থানীয় দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীর অনুসারীদের মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা ও জোর লবিং শুরু হয়েছে।


দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেট জেলা বিএনপির বর্তমান কমিটির মেয়াদ বেশ আগেই শেষ হয়েছে এবং মহানগর কমিটির মেয়াদও শেষের পথে। অন্যদিকে মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলা বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই স্থবিরতা কাটাতে অচিরেই সিলেট জেলা ও মহানগরে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হতে পারে।


২০২২ সালের ২৯ মার্চ সিলেট জেলা বিএনপির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী সভাপতি, অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক এবং মো. শামীম আহমদ সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর ঠিক এক বছর পর ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ জেলা কমিটির তালিকা প্রকাশ করা হয়। তবে বর্তমানে সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক এবং সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গুরুত্বপূর্ণ এই দুই পদে আসীন হওয়ায় জেলায় দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতিশীলতা কমে গেছে এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।


অপরদিকে, মহানগর কমিটি চলছে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি দিয়ে। ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর রেজাউল হাসান কয়েছ লোদীকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও ইমদাদ হোসেন চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৭০ সদস্যের কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তবে ১৭ মাস পার হলেও মহানগরীর ৪২টি ওয়ার্ডের পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি। একাধিক ওয়ার্ডে এখনো মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে কার্যক্রম।


তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সিলেটে বিএনপির সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষী ব্যাপকভাবে বাড়লেও শক্তিশালী নেতৃত্বের অভাবে সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। মহানগরীর শীর্ষ দুই নেতা সিলেট আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের প্রতি সপ্তাহের সিলেট সফর এবং প্রটোকল নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে।


একই অবস্থা জেলা কমিটিতেও। সিলেট-৪ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর প্রতি সপ্তাহের সিলেট সফরকালীন তাঁর অনুসারী জেলা ও মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা সারাক্ষণ মন্ত্রীর পাশে থাকেন। তৃণমূলের মতে, দুই মন্ত্রীই নিজ নিজ অনুসারীদের শীর্ষ পদ পাইয়ে দিতে কেন্দ্রে জোর তদবির চালাচ্ছেন, যা নেতাকর্মীদের মাঝে বিভক্তি বাড়াচ্ছে।


দলীয় একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি অনুযায়ী, জেলা বিএনপির বর্তমান কমিটি বিলুপ্ত করে একজন আহ্বায়ক, একাধিক যৌথ আহ্বায়ক ও একজন সদস্য সচিবসহ নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের প্রস্তুতি চলছে।


আহ্বায়ক পদে আলোচনায় আছে ৪ নেতার নাম। তাঁরা হলেন, দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-ক্ষুদ্র ঋণ ও শিল্পবিষয়ক সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক, বর্তমান জেলা সভাপতি ও সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রনেতা শামসুজ্জামান জামান ও জেলা বিএনপির সদস্য

ফয়সল আহমদ চৌধুরী। 


সদস্য সচিব পদে জোর আলোচনায় আছেন জেলা বিএনপির নির্বাচিত সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শামীম আহমদ, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমদ সিদ্দিকী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান পাপলু এবং জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আব্দুল আহাদ খান জামাল। তবে লবিং ও তৎপরতায় এই পদে অনেকটাই এগিয়ে আছেন ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী ও আহাদ খান জামাল।


মহানগর কমিটিতেও আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব—উভয় পদেই বড় পরিবর্তনের আভাস মিলছে। আহ্বায়ক পদে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে ৩ নেতার নাম। তাঁরা হলেন, মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নাসিম হোসাইন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম,সাবেক আহ্বায়ক আবদুল কাইয়ুম জালালী পংকি।


সদস্য সচিব পদে জোর আলোচনায় রয়েছেন নজিবুর রহমান নজিব (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, মহানগর বিএনপি),নেওয়াজ বক্ত চৌধুরী তারেক (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, মহানগর বিএনপি),রেজাউল করিম আলো (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, মহানগর বিএনপি) ও তারেক আহমদ খান (বর্তমান দপ্তর সম্পাদক, মহানগর বিএনপি)



সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ্ সিদ্দিকী বলেন,আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তার আগেই জেলা ও মহানগর কমিটিগুলোর পুনর্গঠন সম্পন্ন করার নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্র। যেসব জেলায় বর্তমানে আহ্বায়ক কমিটি রয়েছে, সেখানে দ্রুত সম্মেলন ও কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপিকেও নতুনভাবে, শক্তিশালী ও গতিশীল রূপে সাজানোর চিন্তা করছে হাইকমান্ড।

ডি আর ডি

মন্তব্য করুন: