সুনামগঞ্জে মাদক কারবারিদের দাপটে আতঙ্কে প্রতিবাদীরা
মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার সাধারণ মানুষ এখন উল্টো মাদক কারবারিদের পাতা ফাঁদে জড়ানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। সম্প্রতি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহনপুর গ্রামে মাদকবিরোধী কার্যক্রমে সাক্ষী ও নালিশকারী হওয়ায় প্রভাবশালী মাদক কারবারিরা তাঁদের বিভিন্নভাবে ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় অসৎ সদস্যকে ‘ম্যানেজ’ করে নিরীহ মানুষের বাড়িঘরে তল্লাশি ও থানায় তলব করার মতো গুরুতর অভিযোগও পাওয়া গেছে। এ নিয়ে মাদকবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৩ মার্চ মোহনপুর মাদক প্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গ্রামবাসী একাট্টা হয়ে মাদক কারবারিদের তালিকা প্রস্তুত করেন। পরে ২৮ মার্চ চূড়ান্ত তালিকা ধরে চিহ্নিত মাদক কারবারি ও ‘ইয়াবার ভাইরাল ডিলার’ খ্যাত রেজাউল, কাসেম, সালমান, রোমেনসহ বেশ কয়েকজনকে তলব করা হয়। সভায় তারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে এবং ভবিষ্যতে আর মাদক ব্যবসা করবে না মর্মে লিখিত মুচলেকা দিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চায়। সেই স্বীকারোক্তির ভিডিও ক্লিপও এখন স্থানীয়দের হাতে হাতে। ওই সময় গ্রামবাসী তাদের সংশোধনের সুযোগ দিয়ে সাময়িক ক্ষমা করেন এবং সদর থানা-পুলিশকে বিষয়টি জানান।
কিন্তু এই ক্ষমার কিছুদিন পরই ইয়াবা ডিলার রেজাউল আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, রেজাউল শহরের একটি রাজনৈতিক দলের বিতর্কিত কয়েকজন নেতা এবং থানা ও ডিবি পুলিশের কয়েকজন অসৎ সদস্যকে হাত করে প্রতিবাদী সাধারণ মানুষকে হয়রানি শুরু করেছে। গত ২৫ এপ্রিল মোহনপুর গ্রামের প্রতিবাদকারী আলেছা বেগমের ঘরে ডিবি পুলিশ পাঠিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। শুধু তা-ই নয়, গতকাল পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে তালিকাভুক্ত এক মাদক কারবারিকে আটকের পর, তার সঙ্গে আলেছা বেগমের এক কিশোর ছেলেকে বিনাদোষে মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগে রেজাউল তার ক্ষতি করতে পারে—এমন আশঙ্কা জানিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন আলেছা বেগম ও আফিজ মিয়া।
এ ছাড়া গ্রামের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান ও আখলাকুর রহমানসহ একাধিক ব্যক্তিকে মাদক দিয়ে ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ী আব্দুর রহমানকে সদর থানার এক পুলিশ কর্মকর্তাকে দিয়ে ফোন করিয়ে ভয় দেখানোর ঘটনাও ঘটেছে। পরে ভুক্তভোগীরা গ্রাম্য সালিসে উপস্থিত হয়ে এই হয়রানির কথা সবাইকে জানান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৯ মে মাদকসহ সুনামগঞ্জ শহর থেকে এই রেজাউল আলমকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ফলে খুব সহজেই জামিনে বেরিয়ে এসে সে এখন নিরপরাধ প্রতিবাদকারীদের ওপর প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
ভুক্তভোগী আব্দুর রহমান ও আফিজ মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কথা বলে এখন আমরাই আতঙ্কে আছি। মাদক ব্যবসায়ীরা পুলিশ দিয়ে আমাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।’
মোহনপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম বলেন, ‘কয়েকজন ভুক্তভোগী আমাদের কাছে নালিশ করেছেন। আমরা শীঘ্রই সম্মিলিতভাবে বসে প্রশাসনের দ্বারস্থ হব এবং মাদক কারবারিদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে কাজ করব।’
মোহনপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মঈনুল হক বলেন, ‘অতীতে যারা আমাদের ভুল বুঝিয়ে ভালো মানুষ সেজে সার্টিফিকেট নিয়েছিল, তাদের মাদক ব্যবসার স্বীকারোক্তির পর সেই সার্টিফিকেট বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতিবাদের কারণে যাদের হয়রানি করা হচ্ছে, আমরা তাদের পাশে থাকব।’
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ রতন বলেন, ‘মোহনপুর গ্রামবাসীর মাদকবিরোধী ভূমিকা প্রশংসনীয়। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকায় নিরীহ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়, তা আমরা দেখছি। আমাদের কোনো সদস্যকে ম্যানেজ করে যদি কাউকে হুমকি দেওয়া হয়, প্রমাণ সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ডিবির ওসি মো. আমিনুল ইসলামও একই আশ্বাস দিয়ে বলেন, কোনো পুলিশ সদস্য মাদক কারবারিদের পক্ষে গিয়ে প্রতিবাদকারীদের হয়রানি করলে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।
প্রীতম দাস/ ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: