সিলেটের মাঠ কাঁপানো ফাহিম চৌধুরীকে নিয়ে নিউজ কমেন্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য!

সংবাদ প্রকাশের পর

সিলেটের মাঠ কাঁপানো ফাহিম চৌধুরীকে নিয়ে নিউজ কমেন্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য!

প্রথম সিলেট প্রতিবেদন

১৯/০৭/২০২৬ ২২:৩১:৫৭

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

যুক্তরাজ্যে একাধিক প্রতারণা ও জালিয়াতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি দেশে ফিরে ছদ্মনাম ও ভুয়া বংশীয় পরিচয় ব্যবহার করে রাতারাতি 'শিল্পপতি', 'সমাজসেবক' ও রাজনৈতিক নেতা বনে যাওয়ার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, আলোচিত এই ব্যক্তির আসল নাম ফাহিম আল ইসহাক, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশে নিজেকে 'ফাহিম চৌধুরী' নামে পরিচয় দিয়ে সমাজে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

অতি সম্প্রতি একটি বিতর্ককে কেন্দ্র করে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে যুক্তরাজ্য আদালতের সাজার রায় এবং ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের মূল প্রতিবেদনের কপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাঁর আসল চেহারা জনসমক্ষে চলে আসে।

নিউজ পোর্টাল প্রথম সিলেটে এই সংবাদটি প্রথম প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন এক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। ফেসবুক আইডিতে নিজেকে সিলেটের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দেওয়া হাফিজুর রহমান ইমন নামের এক ব্যক্তি নিউজের কমেন্ট বক্সে ফাহিম চৌধুরীর অতীত ও যুক্তরাজ্যের মামলার সুনির্দিষ্ট খতিয়ান তুলে ধরে বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন।

তাঁর দেওয়া তথ্য এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৮১ সালের জানুয়ারিতে জন্মগ্রহণ করা ফাহিম আল ইসহাক (২৯ বছর বয়সে) যুক্তরাজ্যের পিটারবরো শহরে বসবাস করতেন। ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যের একটি আদালতে তিনি চুরি করা ক্রেডিট কার্ডের তথ্য ব্যবহার করে প্রতারণা (Fraud)-সংক্রান্ত ৫টি অভিযোগ এবং চোরাই সম্পদ রাখার ১টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। ব্রিটিশ আদালত তাকে ৩ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যম The Evening Telegraph-এ সাংবাদিক স্টিফেন ব্রিগস (Stephen Briggs) ফাহিম আল ইসহাকের এই প্রতারণার মামলার বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তীতে সাজা ভোগ বা আইনি প্রক্রিয়া শেষে তিনি বার্মিংহামে চলে যান এবং 'Fahim Real Estate Holdings Ltd' সহ আবাসন ও আর্থিক খাতের ব্যবসা শুরু করেন। একই সাথে নিজের নেতিবাচক অতীত ঢাকতে একটি ট্রাস্ট গঠন করে সিলেটের শিক্ষার্থীদের বৃত্তি (Scholarship) প্রদানের মাধ্যমে সমাজসেবক সাজার প্রক্রিয়া শুরু করেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ফাহিম আল ইসহাক একসময় সিলেটে একটি নাটকেও অভিনয় করেছিলেন। সিলেটের প্রয়াত সাংবাদিক ম. আনফর আলী রচিত একটি নাটকে অভিনয়কালে তিনি 'ফাহিম আল ইসহাক' নামেই পরিচিত ছিলেন এবং অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে একটি সাধারণ ব্ল্যাকবেরি মোবাইলের মাধ্যমে অনলাইনে হ্যাকিংয়ের দুনিয়ায় তাঁর পথচলা শুরু হয়। একের পর এক নিখুঁত সাইবার অপারেশন ও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে বন্ধুদের নিয়ে জমজমাট পার্টি করা ছিল তাঁর স্বভাব।

যুক্তরাজ্যের আইনি জটিলতা এড়িয়ে বাংলাদেশে এসে ফাহিম সম্পূর্ণ নতুন কৌশলের আশ্রয় নেন। নিজের অপরাধমূলক অতীত আড়াল করতে নামের শেষে যুক্ত করেন 'চৌধুরী' পদবি। অভিযোগ রয়েছে, বিপুল অর্থবল ব্যবহার করে কিছু সুবিধাভোগী কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ইনফ্লুয়েন্সার এবং মূলধারার কিছু সংবাদমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজেকে বড় মাপের শিল্পপতি হিসেবে জাহির করেন। বিপিএল (বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ) সহ বিভিন্ন চাকচিক্যময় বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, কনসার্ট এবং লোকদেখানো সামাজিক কর্মকাণ্ডের স্পন্সর সেজে সোশ্যাল মিডিয়ায় সুপরিকল্পিত পিআর (জনসংযোগ) ক্যাম্পেইন চালান।

এই মেকি জনপ্রিয়তার আড়ালে মূলত তিনি নিজেকে সিলেটের একটি আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রস্তুত করছিলেন এবং জোরেশোরে প্রচারণাও শুরু করেছিলেন।

ফাহিম আল চৌধুরীর এই অতীত প্রকাশ্যে আসতেই নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে নিয়ে তৈরি হয়েছে হাজারো ট্রল ও মিম। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—কীভাবে একজন সাজাপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক প্রতারক দেশের বড় বড় ইভেন্টে পৃষ্ঠপোষকতা করার সুযোগ পায় এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে জায়গা করে নেওয়ার দুঃসাহস দেখায়।

এই তথ্য ফাঁসের পর সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দেশের সেইসব কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা, যারা অন্ধ মোহে বা সুবিধার বিনিময়ে তাঁর ঢালাও প্রচার করছিলেন। নেটিজেনদের তোপের মুখে অনেকেই এখন লোকলজ্জার ভয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ফাহিমের সাথে থাকা তাঁদের পুরনো ছবি ও ভিডিও সরিয়ে নিচ্ছেন।

এসব গুরুতর অভিযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া নথিপত্রের বিষয়ে ‘কথিত’ ফাহিম আল চৌধুরীর মন্তব্য জানার জন্য তাঁর বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠজনের সাথে যোগাযোগ করা হলেও, কেউ তাঁর ব্যক্তিগত ফোন নাম্বার দিতে রাজি হননি। ফলে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

সচেতন মহল মনে করছেন, অর্থ ও সস্তা প্রচারণার জোরে সমাজে অপরাধীদের এভাবে রাতারাতি তারকা ও নেতা বনে যাওয়ার বিপজ্জনক প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রশাসনের দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। একজন আন্তর্জাতিক সাজাপ্রাপ্ত আসামির এমন চাতুর্যপূর্ণ উত্থানের নেপথ্যে কারা ছিল, তা খতিয়ে দেখতে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ নাগরিকরা।

তাহির আহমদ

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad