সুরের মিলনমেলা: জগন্নাথপুরে বর্ণাঢ্য ধামাইল দিবস ও লোক-উৎসব
ভাটি বাংলার হিজল-তমাল আর হাওরের ঢেউয়ে যার সুর আজো ভেসে বেড়ায়, সেই মরমি সাধক ও বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্তের অমর সৃষ্টি ধামাইল গানকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে বসেছিল এক অপূর্ব সুরের মেলা। গত ২৬ মে (মঙ্গলবার) উৎসবমুখর ও বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে লোকসংস্কৃতির অন্যতম এই পুরোধার স্মরণে ‘ধামাইল দিবস ও ধামাইল উৎসব’। ‘বাংলাদেশ ধামাইল উন্নয়ন পরিষদ’ কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে দিনব্যাপী নানামুখী কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবের আয়োজন করা হয়।
মঙ্গলবার ভোরের আলো ফোটার পর থেকেই জগন্নাথপুরের কেশবপুর রূপ নেয় এক পলিমাটির উৎসবের আঙিনায়। সকালের স্নিগ্ধ লগ্নে বৈষ্ণব কবির নিজ বাড়ি ও সমাধিস্থলে গভীর শ্রদ্ধায় পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিবসের মূল আনুষ্ঠানিকতা।
এরপর উপজেলার কেশবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নান্দনিক হলরুমটি ধামাইল শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী এবং রাধারমণ ভক্তদের এক অভূতপূর্ব মিলনমেলায় পরিণত হয়। কবির কালজয়ী গানের সুরের মূর্ছনায় মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা, যেন প্রাণ ফিরে পায় শত বছরের লোক-ঐতিহ্য।
পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে বিদ্যালয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় এক তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা সভা। বাংলাদেশ ধামাইল উন্নয়ন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির আয়োজনে এই উৎসবে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট গীতিকার মোঃ আছকির আলী। কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোঃ মোশাররফ হোসেন (মুছা) ও সাধারণ সম্পাদিকা নিপা সূত্রধরের যৌথ ও প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মোঃ আবু হুরায়রা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মোঃ আবু হুরায়রা বলেন, -বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্তের ধামাইল গান আমাদের হাজার বছরের লোকসংস্কৃতির এক অনন্য ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে টিকিয়ে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে আমাদের সবাইকে দলমত নির্বিশেষে একযোগে কাজ করতে হবে।
সভায় বক্তারা ধামাইল সংস্কৃতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে কিছুটা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আধুনিকতার দাপটে বাংলার গ্রামীণ জনপদের এই সোনালী ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এই লোক-ঐতিহ্যকে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবিত করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। বিশ্বব্যাপী ধামাইল সঙ্গীতকে পরিচিত করে তুলতে এ ধরণের উৎসব ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি ভূমিকা রাখতে পারে বলে তারা জোরালো দাবি জানান।
গুণীজনদের উপস্থিতি ও সংহতি
উৎসবে বিশেষ অতিথি হিসেবে লোকসংস্কৃতির নানাদিক নিয়ে মূল্যবান বক্তব্য রাখেন: দ্রুপদ চৌধুরী (নূপুর): সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ধামাইল উন্নয়ন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি।
দিলীপ কুমার রায়: সহযোগী অধ্যাপক (গণিত বিভাগ, সিলেট এম.সি কলেজ) ও সাধারণ সম্পাদক (সিলেট বিভাগ)। মোঃ হাবিল মিয়া: বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ। চিনু চক্রবর্তী: কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক। সুপ্রভা রাণী কর: কোষাধ্যক্ষ। নিপ্রেশ তালুকদার (রানু): দপ্তর সম্পাদক। রজত চক্রবর্তী: সিলেট বিভাগীয় সভাপতি।
এছাড়াও রাধারমণ অনুরাগী ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিশেন্দু কুমার দেব, মাধুরী তালুকদার (মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা), দিলীপ কুমার দাশ ও দিপক দাশ (শান্তিগঞ্জ উপজেলা শাখা), এবং অসীম রায় চৌধুরী ও অমীয় রায় (অশোক) (দিরাই উপজেলা শাখা)।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য শিমুল পাল, জন দাস, ববিতা বর্মন, স্নেহা দাশ (তুলি), লন্ডন প্রবাসী আব্দুল শামীম, শিক্ষক জায়েদ হোসেইন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জিলু মিয়া, রমজান আলীসহ স্থানীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ।
করতালি আর পায়ের ছন্দে মাতল আঙিনা
আলোচনা সভা শেষে শুরু হয় উৎসবের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—যার জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় ছিলেন ভক্তরা। সুরের তরঙ্গে কেঁপে ওঠে হলরুম। শুরু হয় উৎসবের মূল আকর্ষণ ধামাইল গান ও নৃত্য পরিবেশনা।
সিলেট বিভাগের বিভিন্ন উপজেলা থেকে আগত ধামাইল দলগুলো একে একে রাধারমণ দত্তের কালজয়ী ধামাইল গানগুলো পরিবেশন করতে শুরু করে। শিল্পীদের হাতের তালি, পায়ের নিখুঁত ছন্দ আর রাধারমণীয় ভাবের উদাসী সুরের আবহে হলরুম কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। উপস্থিত শত শত ধামাইলপ্রেমী ও ভক্তরা এক গভীর আত্মিক প্রশান্তিতে এই নান্দনিক পরিবেশনা উপভোগ করেন।
দিনব্যাপী চলা এই ধামাইল উৎসব কেশবপুরের আকাশ-বাতাসকে এক স্মরণীয় সাংস্কৃতিক ও মরমি আবহে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, যা দীর্ঘকাল ধামাইলপ্রেমীদের হৃদয়ে ভাস্বর হয়ে থাকবে।
তাহির আহমদ/ প্রীতম দাস
মন্তব্য করুন: