বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে আসছে নতুন মুখ, আলোচনায় ৫ নেতা
সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত সব কমিটি ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
নিষ্ক্রিয় নেতাদের বাদ দিয়ে তরুণ, ত্যাগী ও সাহসী নেতৃত্বকে সামনে আনার পাশাপাশি অভিজ্ঞ নেতাদেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে দলটি।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে সব মহানগর, জেলা ও উপজেলা কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।
সামনে জাতীয় কাউন্সিল ও বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দলকে আরও সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় নেতাদের মতে, দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে গেলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো সুযোগ নিতে পারে। তাই এখন দল পুনর্গঠনই বড় চ্যালেঞ্জ।
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা জানান, আপাতত সরকারের কার্যক্রম শীর্ষ নেতৃত্বের অগ্রাধিকার হলেও, দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর পর জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে চলতি বছরের ডিসেম্বরে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর এবার দল পুনর্গঠন ও সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করায় মনোযোগ দেবে দলটি।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কাউন্সিলের আগেই স্থায়ী কমিটির শূন্য পদ পূরণ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। আলোচনা রয়েছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম, কিংবা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বা ড. আব্দুল মঈন খানের মতো জ্যেষ্ঠ নেতারা রাষ্ট্রপতি বা সংসদের গুরুত্বপূর্ণ পদে গেলে স্থায়ী কমিটিতে শূন্যতা তৈরি হবে।
এদিকে দলটির আরও কয়েকজন স্থায়ী কমিটির সদস্য বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে গেছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া ও লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বয়সের ভারে অসুস্থ থাকায় অনেক বছর ধরেই দলীয় কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছেন না।
এছাড়া বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমেদ দলের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দলের সাংগঠনিক পদে না থাকায় নতুন নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্থায়ী কমিটি বিএনপির সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম হিসেবে বিবেচিত। এখানে সাধারণত পরীক্ষিত, ত্যাগী ও গ্রহণযোগ্য নেতাদেরই অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নির্বাচন কৌশল নির্ধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি প্রণয়নে এই কমিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে নেতৃত্বের একাধিক স্তর রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি। এ ছাড়া রয়েছে ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা, যুগ্ম মহাসচিব, সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি। সর্বশেষ ২০১৬ সালের কাউন্সিলের আগে স্থায়ী কমিটির সদস্যের পদ রাখা হয় ১৯টি। যদিও নানা কারণে বর্তমানেও ফোরামে শূন্য পদ রয়ে গেছে।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৬ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী এ ফোরামে ছিলেন ১৬ জন। সে সময় নতুন করে স্থায়ী কমিটিতে যুক্ত হন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ও অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
এরই মধ্যে মারা গেছেন বেগম খালেদা জিয়া এবং ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। আর স্পিকারের দায়িত্ব পাওয়ায় পদ ছাড়েন হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা হলেন পদাধিকারবলে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অন্যদের মধ্যে রয়েছেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাউদ্দিন আহমদ, বেগম সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
সাংগঠনিক কাজে অনেকেই সক্রিয় থাকলেও স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া কয়েক বছর ধরে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী আছেন। এ ছাড়া গত রমজান থেকে অসুস্থ হয়ে দেশের বাইরে চিকিৎসাধীন আছেন মির্জা আব্বাস।
বিএনপির কয়েকজন স্থায়ী কমিটির সদস্যের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বেশ কিছু পদ শূন্য থাকায় নতুন করে স্থায়ী কমিটিতে যুক্ত হতে পারেন দলটির ভাইস চেয়ারম্যান ও সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ ও অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তারা পাঁচজনই মূলত আলোচনায় শীর্ষে রয়েছেন। এ ছাড়া স্থায়ী কমিটিতে আরও দুজনের নাম আলোচনায় রয়েছে- বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু ও চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা সীমাবদ্ধতার কারণে গত ১০ বছর দলীয় কাউন্সিল হয়নি।
তবে এ সময় আমাদের সাংগঠনিক কাজ থেমে থাকেনি। আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’ তবে নতুন নেতৃত্বে কারা আসছেন বা কাউন্সিলের সুনির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর সরকার গঠনে আসা বিএনপির জন্য এই মুহূর্তে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম পুনর্গঠন অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত হওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর মূল চ্যালেঞ্জ থাকে সংসদীয় দায়িত্ব এবং দলীয় সংগঠনের ভারসাম্য রক্ষা করা। প্রবীণ ও শারীরিক অসুস্থতায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া নেতাদের স্থলাভিষিক্ত করে রাজপথের পরীক্ষিত ও নতুন মুখদের স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হলে দলের সাংগঠনিক গতিশীলতা বহুগুণ বাড়বে।
একই সঙ্গে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও বিএনপি এর ইতিবাচক সুফল পাবে বলে মনে করেন তারা।
রত্না বাউরী
মন্তব্য করুন: