শাহেদ আলী'র 'জীবনকথা': একটি পর্যালোচনা
শাহেদ আলীকে এখন আমাদের আর আলাদা করে পরিচয় করানোর কিছু নেই। তিনি ছিলেন বড় লেখক ও কথাশিল্পী। যদিও তাঁর সব লেখা যে আমি পড়েছি- তা নয়। তবে যতটা যা-ই পড়েছি, এর মধ্যে বেশ দেরিতে পড়েছি তাঁর 'জীবনকথা'। এটা বাতিঘরের প্রকাশনা, সম্ভবত ২০১৯ সালে এটা প্রথম প্রকাশিত হয়। এর লেখক ছিলেন যেহেতু শাহেদ আলী, তাই বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের কাছে এরকম বইয়ের প্রকাশনা ছিল প্রত্যাশিতই। স্বভাবত এটা একটা আশার কথা ছিল যে, সাহিত্যানুরাগীদের কাছে এটা ঢেউ তুলবে এবং একই সাথে নজর কাড়বে- অন্তত সুনামগঞ্জের সব বিদ্যোৎসাহী মানুষের। যদিও শাহেদ আলী'র পাঠকবিশ্বের সীমানা ছিল বিশাল, তাই সে ঢেউ আমাদের নজর এড়িয়ে গেলেও এখানে দুঃখ হলো সেসব বিদ্যোৎসাহী ও লেখকদের অজ্ঞতা ছিল লক্ষণীয়। কিন্তু এখন এটা একটা ক্রান্তিকালও বটে, তা-ই সেদিকে আর যাই না।
এখানে আমরা শাহেদ আলী'কে দেখবো যে, 'অশ্রু' ছিল তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্প এবং এর থেকে 'জীবনকথা' পর্যন্ত তিনি ছিলেন একই স্রোতবাহী। বলা বাহুল্য এখানেও তিনি বজায় রেখে গেছেন তাঁর শিল্পভাষ্যের পরম্পরা। এটা যেহেতু একটা আত্মজীবনী, তাই এর লেখক শাহেদ আলী এখানে লিখেছেন তাঁর ফেলে আসা দিনের কথা, স্মরণ করেছেন শৈশব ও কৈশোর; তাঁর সাহিত্যজীবন এবং রাজনীতিকে। ফলে বিদ্যোৎসাহী থেকে অনুসন্ধানী পাঠক এখানে পেতে পারেন সে সময়কার লোকজীবন ও সমাজচিত্রের একটা প্রতিবেদন। আত্মজীবনীগুলো এই অর্থে আমাদের ইতিহাস- সামাজিক ইতিহাসের উপাদানের যোগানদাতা বলতে হয়। কারণ এটা একার রচনা হলেও ব্যক্তি-লেখক সমাজসত্তার বাইরের কেউ নন, সে নিরিখে এখানে থাকে তাঁর সামাজিকতা তথা সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতার বয়ান। স্বভাবত এসব থেকে একটা গ্রাম, তার অধিবাসী, হাওর, কৃষি, আলস্য ও বিনোদনের তথ্য সম্পর্কে ধারনার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এখানেও আমরা এর ব্যত্যয় দেখি না। বলতে গেলে এখানকার প্রতিটি শব্দে তৈরি হয়েছে এই স্মৃতির শরীর- আটপৌরে সে হাওরপাড়ের কৃষি, চাষযোগ্য জমি ও সামন্তের আত্মজীবনী। এখানে কেবল ভাষা নেই, আছে শিল্পীর সুখ-দুঃখ ও তাঁর সৌন্দর্য নির্মাণের কথা, প্রতিটি পরিচ্ছদ জুড়ে লেখকের সৃষ্টিচেতনা ও কালের সাক্ষ্য। এসব নিয়েই আাসলে তৈরি হয়েছে এই বই। এখানে শাহেদ আলী কেবল গল্পকার ছিলেন না, ছিলেন শিক্ষক এবং রাজনীতির মানুষ। এসব প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিলেন সোনা ফলানো তা সত্য। তবে আমার কাছে তাঁর আবেদন ছিল বরাবর তাঁর কথাশিল্পী'র প্রতি'ই। এছাড়াও এখানে প্রাণিত হবার কথা হচ্ছে যে, তিনি ছিলেন আমাদের জেলা- সুনামগঞ্জের মানুষ। প্রথম দিকে জিব্রাইলের ডানা দিয়ে আমরা তাঁর শক্তিমত্তার সাথে পরিচিত হয়ে উঠেছিলাম। বাঙালি পাঠকমন নিশ্চয়ই এখনও তাঁর সে সংক্রাম বা আস্বাদ ভুলে যায়নি। এটা ছিল তাঁর প্রথম প্রকাশিত কোনও গল্পের বই। বাংলা ভাষাভাষী পাঠকগোষ্ঠী এখনও তাঁকে চেনে অধ্যাপক শাহেদ আলী নয়, জিব্রাইলের ডানা'র লেখক- শাহেদ আলী হিসেবে। সম্ভবত সমগ্র বাংলা সাহিত্যে এমন দ্বিতীয় আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। অবশ্য এর বাইরেও তিনি লিখেছেন। এর মধ্যে সর্বশেষ কোনও লেখা বা বই হিসেবে আমরা ধরে নিতে পারি তাঁর এই 'জীবনকথা'কে।
আগেই বলেছি আমি শাহেদ আলী'র এ বইটা পড়েছি দেরিতে। একটা সময় যখন তাঁর যা কিছু সামনে পেয়েছি, তা-ই পড়ে গিয়েছি; পরে পড়বো বলে ফেলে রাখিনি। সমস্যা হলো এখন সে অবসর কোথায়? তবে মনে পড়ে করোনাকালও ভালো কিছু সুযোগ আমাদের জন্য সৃষ্টি করে দিয়েছিল, যেমন এই সময়টাতে আমি কিছু না পড়া বই পড়েছিলাম। (অনেক প্রসূতি মা কি না তখন জন্ম দিয়েছিলেন সিজারহীন সন্তান- এসবও তো মিথ্যে নয়।) যাক, আমার সে পুনর্পাঠে কাফকা ও কামু'র সাথে মনে হয় তখন শাহেদ আলী'র এই বই পড়েছিলাম। তারপর দীর্ঘদিন তার অবস্থানের কথা মনে রাখিনি। কিন্তু একটা আলাপসূত্রে সেই গুণী শিল্পীর কথাটা আবার মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে জেনেছিলাম যে, বাড়ি তাঁর তাহিরপুরের মাহমুদপুর হলেও লেখক ঢাকাতে থাকেন। তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের সাথে কেউ যোগাযোগ করিয়ে দেবেন বলেও সেটা তাঁর করা হয়নি। ফলে দেখার আর সুযোগ হয়ে উঠেনি শাহেদ আলীকে। তবে তিনি থেকে গিয়েছিলেন আমাদের সান্ধ্যকথা ও পঠনপাঠনে, সর্বশেষ তাঁর শতবার্ষিক জন্মদিনের আলোচনায়ও বলেছি- তাঁর না ফুরিয়ে যাবার কথা। সমস্যা হলো আমরা এখনও তাঁর সম্পর্কে কত কম জানি! এখানে পরের মুখে ঝাল খাওয়ার লোকের অভাব নেই, এছাড়া সত্তা থেকে বিযুক্ত মানুষ আর কতটা সম্পৃক্ত থাকতে পারে স্বপ্ন ও সৌন্দর্যের পাঠে? তবুও শাহেদ আলী আছেন, এখানে এই 'জীবনকথা' হচ্ছে তাঁর সেরকম কাজ। এটা হলো আসলে জীবনের কথা। জীবন জড়িয়ে থাকে যে ভালবাসা, এর প্রবেশমুখে আমরা পেয়ে যাই তাঁর সাক্ষাৎ। তাঁর পিতা- ইসমাইল আলী ছিলেন পুঁথিসাহিত্যের পাঠক, এই পাঠকৃতি ছিল তাঁর সাহিত্যমন- 'প্রেরণার উৎসভূমি'। এখানে লেখক স্বীকার করেছেন তাঁর পিতার প্রতি অপরিশোধ্য ঋণ এবং বইটা উৎসর্গও করেছেন তাঁকে। যদিও লেখক এখানে কবে নাগাদ এই আত্মজীবনী লেখার কাজ শুরু করেন আমরা তা জানতে পারি না। তবে আমরা যদি এর প্রকাশকাল খেয়াল করি, তা হলে দেখবো- শাহেদ আলী'র' জন্ম- ২৬ মে, ১৯২৫ এবং তিনি মারা গিয়েছেন- ৬ নভেম্বর, ২০০১ খ্রি.তে; এখানে তাঁর মৃত্যুর দেড় যুগ পর- ২০১৯ খ্রি.তে প্রকাশিত হচ্ছে এই বই। সে নিরিখে এর ভূমিকাটা লেখতে হয়েছে তাঁর স্ত্রী- চেমন আরা'কে।
এখানে লেখক শাহেদ আলী শুরুতে নিয়ে এসেছেন তাঁর 'পূর্বপুরুষ' এর কথা। তিনি ছিলেন তাঁর পিতামাতার দ্বিতীয় সন্তান, প্রথম ছিলেন এক বোন- মারা গেলে তিনি হন প্রথম এবং স্বভাবত তাঁকে নিয়ে দুশ্চিন্তার মাত্রাটা ছিল বেশীই। তাঁদের পরিবার ছিল 'এজমালি'- বড় পরিবার। রোগব্যাধির প্রকোপ তখন কম ছিল না। আশ্বিন- কার্তিকে কলেরার ভয় ছিল নিয়মিত, গ্রাম তখন প্রায় শূন্য হবার জোগার হতো। শাহেদের বয়স যখন ৫ বছর, তখন এরকম এক হানায় তাদের বাড়িতেই মারা গিয়েছিল আঠারো জন! তখন এই শাহেদও আক্রান্ত হয়েছিলেন, দাদির মোনাজাত ছিল তখন তাঁর জন্য বাবরের প্রার্থনা- এতে শাহেদ সুস্থ হলেও 'চিরদিনের জন্য' চলে গেলেন তাঁর দাদি। মাহমুদপুরে তখনও ছিল না কোনও স্কুল, কাচারিঘরের মক্তবে শেখানো হতো আরবি ও ধর্মশিক্ষা। এখানকার অর্থনীতির প্রধান দিক বা উপায়টা ছিল কৃষি'ই, সমস্যা হলো স্থানীয় হিসেবে কি না এটা আবার তাঁদেরকে শিখতে হচ্ছে বাইরে থেকে আসা শ্রমজীবীদের থেকে। জীবনের সংগ্রামই জীবনকে পথ দেখায় ও পুষ্টি জোগায়, লেখক এটা বলতে ভুলছেন না সে নিরিখে এখানে তাঁদের মধ্যে দেখা যায় বিত্তবান শ্রেণি। আমরা দেখি- দুর্লভপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে শাহেদ আলী এখানে ভর্তি হন। বারহাট্টা ছিল তাঁর নানাবাড়ি, নানা ছিলেন 'হাজী সাহেব', তিনি কবে মারা গিয়েছিলেন সেটা শাহেদ জানতেন না। তবে দীর্ঘদিন বেঁচে নানীর মৃত্যু হলে পরবর্তীতে তিনি লিখেছেন, 'নানীর ইন্তেকাল'। সাঁত ব্যুভ সম্পর্কে আমার খুব একটা জানা নেই, তবে এখানে তাঁর একটা কথার উল্লেখ মনে হয় বেশ প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, 'লেখকের জীবন ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই লেখার মানদণ্ড, অর্থাৎ লেখককে তাঁর সাহিত্যকর্ম থেকে আলাদা করা যায় না।' (শোকের দিনলিপি, রোলাঁ বার্ত, পৃ- ৮৭) এখানে আমরা দেখবো শাহেদ আলীর সে শিল্পমানস বা ভূমি- অন্য কোথাও নয়, সেটা আছে একই ভাবে তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতাতে এবং পরবর্তীতে এসব তাঁর থেকে লাভ করেছিল একটা শিল্পভাষা। এখানে এখন 'জীবনকথা'য় আমরা পড়ছি সে শিল্পভাষা ও নির্মাণের সুলুক সন্ধান।
আমরা জানতে পেরেছি যে, শাহেদ আলীদের পরিবার ছিল এজমালি- বড় পরিবার। কালের নিয়মে সবকিছুই ভেঙে পড়ে, তাঁদের পরিবারও আর এক থাকেনি- একসময় ভেঙে যায়। কিন্তু এখানে একটা অত্যধিক মনোযোগের ব্যাপার হচ্ছে, সমান ভাগে ভাগ হলেও শ্রম ও নিষ্ঠায় একসময় লোকদের অর্থনৈতিক জীবনে তৈরি হয় বিস্তর পার্থক্য। তখন ধান কাটার লোকেরা আসতেন ফরিদপুর ও বরিশাল থেকে, তাঁরা নিতেন আট ভাগের এক ভাগ- এই ছিল হিসেব। এখানে বর্ষাতে ছিল এর অন্যরূপ, পাখিদের দেশ হলে কী হবে- ছয় মাস তখন তাঁদেরকে ঘরে বন্দী থাকতে হয়। এখানকার চিরকিশোরেরা তখন 'গাছে উঠে ঝাঁপ দিয়ে পানিতে' পড়তো। 'হিজল-বরজ গাছে' কুণ্ডলি পাকাতো জাতিসাপেরা, মুন্সিগঞ্জ থেকে আসা সাপুড়ে আসে এবং এসব ধরে নিয়ে যায়। গ্রাম-বাংলার এই ভাটিচিত্রের প্রকৃতি ও স্বরূপ আমরা দেখি- একই এবং স্থির। এর পরেই লেখক বয়ান করেন তাঁর শিক্ষাজীবন। তখনকার সময়ের কথা বিবেচনা করলে সে চিত্র সুখের ছিল না, বলতে গেলে শিশু শিক্ষার জন্য ছিল প্রত্যেকের এক ও অভেদ্য সংগ্রাম। আগেই বলেছি দুর্লভপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে এখানে ভর্তি হয়েছিলেন শাহেদ। কিন্তু বেদনাদায়ক সংবাদ হলো সে স্কুলটি একসময় বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে তাঁকে গ্রামে ফিরতে হয়। অবশ্য এখানকার 'পোড়া ভিটায়'ও একটা সময় তৈরি হয়ে যায় স্কুল, শাহেদ এবার এখানে ভর্তি হলেন দুই বছর পর। ভালো ছাত্র তো ছিলেনই। ধর্মপাশার ছেলেও শাহেদ, তাঁর ছিল আশা; যদিও পরবর্তীতে তাঁদের ইউনিয়ন তাহিরপুরের সাথে যুক্ত হলে আর ধর্মপাশার থাকেননি। তবুও এই বয়ানভাষ্যে তাঁর স্বীকারোক্তি হচ্ছে, 'ধর্মপাশাকেই আমাদের বেশি আপন মনে হয়।' এখানে শিক্ষাজীবনের পরতে পরতে আমরা পাঠ করি শাহেদ আলী'র সে ফেলে আসা সময়ের পর্যবেক্ষণ।
বলা বাহুল্য জীবনসত্তার কর্তৃপক্ষের নাম হচ্ছে রাজনীতি। আমরা জানি শাহেদ ছিলেন এই রাজনীতির একটা পর্বে সফল পুরুষ। এখানে সেটা তো থাকছেই, তাই বাদ যায়নি তখনকার সময়ে 'সিলেট রেফারেন্ডাম' ইস্যু। রাজনৈতিক সাহিত্যে সেটা প্রায়ই ঘুরেফিরে আসে। শাহেদ এটা নিয়ে একটা পরিচ্ছদ ও লিখে গিয়েছেন তাঁর ভাষ্য। যদিও সিলেট ছিল আসামের একটা জেলা, তখন এর নেতৃত্বে ছিল কারা? তাঁরা ছিল- 'সিলেটিরা', এখানে তাঁরা এই রেফারেন্ডাম কী পাকিস্তান আন্দোলনে কম ভূমিকা রাখেনি। কথা হচ্ছে ১৯৪৭ যা কারও কাছে নিয়ে এসেছিল দেশভাগ, অপর দিকে শাহেদ আলীদের সময়ের সাক্ষ্য ছিল বিপরীতে- 'আমরা একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছিলাম।' (মনে পড়ছে 'ভারত কী করে ভাগ হলো'তে বিমলানন্দ শাসমলও এর তাৎপর্য বিশাল ছিল বলে মন্তব্য করে গেছেন। অন্যথায়- বাংলাদেশের প্রসববেদনা ও জন্ম হতো কঠিন- এই ছিল তাঁর মত।) যদিও এখানে শাহেদ আলীর অভিমত ছিল, সেটা সম্পন্ন হয়েছে কোনও সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি ছাড়াই। এক্ষেত্রে মানছি তাঁর সচেতনতা ছিল বিস্ময়কর। সেরকম একটা সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রশ্ন ও প্রয়োজনীতা থেকে কি না ৪৭ সালে জন্ম নেয় 'তমদ্দুন মজলিস'। আমরা দেখি- শাহেদ আলী তো মাহমদ আলী'র সাথে ছিলেনই, উঠতি যৌবনের 'সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক' সে অভিজ্ঞতা নিয়ে ঢাকা গেলে তমদ্দুন মজলিসের সাথে তাঁর জড়িয়ে পড়তে অসুবিধা হয়নি। জেনেছি মুনীর চৌধুরীরাও তখন এই মজলিসের আলোচনা সভাতে যোগ দিতেন। 'তমদ্দুন মজলিস' রাষ্ট্রভাষা বাংলার সপক্ষে ভূমিকা রাখা প্রথম সংগঠনের মর্যাদা লাভ করে।
এখানে লেখক শাহেদ আলী কেবল সংগঠনচর্চার মানুষ ছিলেন না, পরবর্তীতে অধ্যাপনা করলেও রাজনীতিতে ছিলেন রব্বানী পার্টির কর্মী ও নেতা। যদিও ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্টে তাঁর পার্টি অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। তাতে কী? তখন 'খেলাফতে রব্বানী পার্টি' বাধ্য হয়ে দশটি আসনে তাদের নিজস্ব নমিনির নাম ঘোষণা করে।' পার্টির নির্দেশ সিলেটের ১নম্বর আসনের প্রার্থী- শাহেদ আলী। ৫১তে যাঁর পড়াশোনা শেষ হয়ে গিয়েছিল, এই কবছর করে গেছেন কলেজে পাঠদান তথা অধ্যাপনা; এবার তাঁকে করতে হচ্ছে ৫৪ এর নির্বাচন। কিন্তু ধর্মপাশা, তাহিরপুর ও জামালগঞ্জবাসীর কজনই বা তাঁকে চেনে? মকবুল হোসেন চৌধুরী- যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী, মুসলিম লীগের সিটিং সদস্য আব্দুল খালেক- এলাকাতে অতি পরিচিত। এর মধ্যে শাহেদ আলী- ভাবা যায়! তবুও মুসলিম লীগ পরাজিত হলো, এখানে যুক্তফ্রন্ট নয়, জয়ী হলো রব্বানী পার্টি- অপরিচিত শাহেদ আলী। পরবর্তীতে যদিও আমরা তাঁকে রাজনীতিতে সেভাবে দেখার সংবাদ আর কিছু পাই না। এখানে আছে 'চট্টগ্রামের ঘূর্ণিঝড়ের' কথা, এসব কেবল নিজের দেখা সময়ের ঘটনা ও তার বয়ান নয়; মানব দুর্দশার সে দালিলিক মূল্য স্বীকার করতে হয়। বলা বাহুল্য এই ভাষাচিত্রে আমরা তখনকার ঝড়ে পড়া মানুষের বাঁচা ও মরাতে ব্যথিত না হয়ে পারি না। এখানে আছে ইসলামিক একাডেমির কথা, বাদ যায়নি 'বাংলা কলেজ ও আবুজর গিফারি কলেজ প্রতিষ্ঠা'র ইতিবৃত্তটাও।
আমরা এই আলোচনার শেষ দিকে চলে এসেছি। এটা না বললেও হয় যে, শাহেদ আলী ছিলেন ভাটিবাংলা বলতে যা বুঝায়, সে-ই গ্রাম-অঞ্চলের মানুষ। এখানকার মানুষের জীবন ও মন হবে তাঁর উপজীব্য তা বলাই বাহুল্য। স্বভাবত আমরা তাঁর রচনাতে পাই কাদামাটির মানুষের প্রাধান্য। এটা তাঁর বিশিষ্টতা মানতে হয়। কিন্তু এখানে যখন তাঁর 'গ্রামীন জীবনের অভিজ্ঞতা পাঠ' করি, তখন কেন জানি মনে হয় এই জার্নিতেও শেষ হয়ে যায়নি তাঁর পর্যবেক্ষণ, বাকী রয়ে গেছে। এবার এখানে একটা উদ্ধৃতি দেই। তখন বৈশাখ শেষ হতে শুরু হয়েছে, শুরু হয়ে গেছে জৈষ্ঠ্যমাস-
'বৃষ্টি শুরু হলো তিন-চার দিন। বৃষ্টি থেমে গিয়ে দিন ফরসা হয়ে এল। আসমানে এখন ঠাঠা রোদ। কল্পনায় এখন আমি আমার এলাকার চিত্রটি মনে-মনে ভাবছি। খলার ধান মারাই শুরু হয়েছে। কেউ ধানের বোঝা মাথায় করে খলায় আনছে, আবার কেউ-বা ধান ওড়াচ্ছে, কেউ-বা বস্তায় ধান ভরে গোলায় তুলছে, কেউ-বা ধানের আঁটি পালা দিচ্ছে, ছোটো-ছোটো বাচ্চা ছেলেমেয়েরা কালি সন্ধ্যার উড়ন্ত ফড়িঙের সঙ্গে আপন মনে খেলা করছে। দাদন ব্যবসায়ীরা দাড়িপাল্লা নিয়ে খলায়-খলায় ঘুরছে ধান নেওয়ার জন্য। আবার ধানের ব্যাপারিরাও নৌকা নিয়ে এসে ভিরছে কৃষকদের খলায় এসে। সব মিলেয়ে এটা আমার ছোটোবেলার স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।' (জীবনকথা, পৃ- ১২৪)
আমরা যাঁরা গ্রামের, পড়েছি- শাহেদ আলী'র 'ফসল তোলার কাহিনী', তাঁদের কাছে এটা নতুন চিত্র নয়। তবুও প্রশ্ন হচ্ছে, শাহেদ আলী লিখেছেন এটা তাঁর ছোটোবেলা- শৈশবের স্মৃতি, এখানে এখনকার জীবন ও সমাজচিত্র কি এর থেকে খু্ব আলাদা বা দূরের? যতটা স্থির হয়ে আছে, সে-ই সামাজিক মন ও ইতিহাসকে বুঝতে মনে হয় এটা তাঁর পাঠককে সাহায্য করতে পারে। আমরা জানি শাহেদ আলী একটা সাহিত্যঘনিষ্ট জীবন কাটিয়ে গিয়েছেন, তাই 'মালয়েশিয়া সাহিত্য-অনুষ্ঠানে সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে যোগাদান এবং 'দুবাই সাহিত্য-সম্মেলনে যোগদান' নিয়েও তিনি স্মৃতি বয়ান করবেন এটা স্বাভাবিক। এসবের বাইরেও এখানে আমরা জানতে পারি, তিনি 'শিশুদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা' করেছেন; মোয়াজ্জেমপুর স্কুল প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর আরেক কীর্তি। এখানে 'জীবনকথা' শেষ হয় তাঁর 'সাহিত্যজীবনে প্রবেশ' এর কথা দিয়ে। দেখি- সওগাত দিয়ে এর শুরু, তখন তিনি জুবিলী'র অষ্টম শ্রেণির ছাত্র; যেমনটা বলেছিলাম, 'অশ্রু' ছিল তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্প। কোথাও পড়েছি, শাহেদ আলী- মাথা নয়, অনুজদের হৃদয় দিয়ে লিখতে বলতেন। আমরা বলবো 'অশ্রু' থেকে 'জীবনকথা' পর্যন্ত তাঁর সে দায় পালনে তিনি হৃদয়বান শিল্পী'ই ছিলেন।
যদিও এখানে একটা বড় 'কিন্তু' আছে, সেটা বলে এবার শেষ করি। মনে পড়ে লোকায়ত দর্শনে দেবীপ্রসাদ বিকাশের দিক থেকে একটা সম্প্রদায় তথা সমাজকে আটকে থাকা সম্প্রদায় বা সমাজ বলে উল্লেখ করেছিলেন। আমাদের কাছে আপাত সে প্রশ্ন নেই; যতটা যা আছে, তা হলো ব্যক্তি প্রসঙ্গ ও তাঁর মন। ৫২ এর পর এই জাতি সৃষ্টি করে নিয়েছিল ৫৪, এখানে তখন কবর রচিত হয়েছিল মুসলিম লীগের। যুক্তফ্রন্টের সামনে ছিল ২১ দফা- একুশের সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি ও স্মরণ। যদিও রব্বানী পার্টি এর অন্তর্ভুক্ত ছিল না, এছাড়া শাহেদ আলী নিজে ছিলেন তমদ্দুন মজলিসের মানুষ। তা হলে তাঁর কাছে ভাষা আন্দোলনের অনুবর্তী ঘটনা ও ইতিহাস- ৭১ কেন মিসিং হবে? এটা কম বড় কথা নয় এবং পাঠক হিসেবে এটা আমাদের কাছে বোধগম্য হচ্ছে না। প্রশ্ন হচ্ছে, তবে কি ৫২'তে উত্তীর্ণ হলেও পাকিস্তানের মধ্যে এসে হৃদয়বান এই শিল্পী ও রাজনীতিক আটকে গিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশের জন্মবৃত্তান্তের কথাটা তাঁর কাছে হয়ে পড়েছিল ব্রাত্য? আমরা জানি না। আপাত দুঃখের কথা আমাদের এখানেই।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: