বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলায় ড. জাফর ইকবাল
‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা আমরা বারবারই বলব’
‘আমাদের কণ্ঠ কেউ রোধ করতে পারবে না। আমাদের পূর্বপুরুষেরা প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন করেছেন। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা আমরা বারবারই বলব। এই দেশ মুক্তিযোদ্ধাদের।’
দীর্ঘ দুই বছর পর কোনো বড় জনসমাগমে প্রকাশ্যে উপস্থিত হয়ে এমন দৃঢ় উচ্চারণ করলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক ও বুদ্ধিজীবী ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সফরে এসে তিনি অংশ নেন ২০২৬ সালের ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলা ও নবী-জিনাত সাহিত্য পুরস্কার’ প্রদান অনুষ্ঠানে।
গত মে মাসে ঘোষিত এই সম্মাননা আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় ১৯ জুলাই নিউজার্সিতে মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক ড. নুরুন নবীর বাসভবনের বিশাল প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে। একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হকসহ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে আগত লেখক, গবেষক, মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা।
অনুষ্ঠানের দিনটি ছিল কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণবার্ষিকী। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে শুরু হয় আয়োজন।
‘একাত্তরের প্রহরী ফাউন্ডেশন’-এর সদস্যসচিব স্বীকৃতি বড়ুয়ার স্বাগত বক্তব্যের পর অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও বইমেলার আহ্বায়ক ড. নুরুন নবী।
পুরস্কার প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিকৃত করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে অবস্থান থেকেই এই বইমেলার সূচনা। যারা বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তর নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখির মাধ্যমে ইতিহাসকে সমুন্নত রাখছেন, তাঁদেরই এই সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা একাত্তরের চেতনা সমুন্নত রেখেই এগিয়ে যাব।’
অনুষ্ঠানে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও ড. ইয়াসমিন হককে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে নেয় বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব ও বঙ্গবন্ধু পরিষদ, নিউইয়র্ক চ্যাপ্টারের নেতারা।
এরপর পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান কবি ফকির ইলিয়াস আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। তিনি বলেন, গভীর বিবেচনা ও সর্বসম্মতিক্রমে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে এ বছরের পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে।
পরে ড. নুরুন নবীর নেতৃত্বে উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা তাঁর হাতে সম্মাননা পদক তুলে দেন। আর্থিক সম্মাননা হিসেবে দুই হাজার মার্কিন ডলারের চেক প্রদান করেন ড. জিনাত নবী।
বক্তব্যে ড. ইয়াসমিন হক বলেন, গত দুই বছর ধরে তাঁরা দেশের বাইরে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। বাংলাদেশের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা অটুট।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশই আমাদের সবকিছু। আমরা দেশে ফিরতে চাই, ফিরবও। আমরা সেই একাত্তরের বাংলাদেশেই ফিরতে চাই।’‘এই দেশের মাটিতে শহীদের রক্ত মিশে আছে’
আবেগঘন বক্তব্যে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল নিজের পরিবারের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁর পিতাকে হত্যা করে মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল। যুদ্ধের সময় তাঁদের পরিবার উদ্বাস্তু হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে। অন্যদিকে ড. নুরুন নবীর মতো অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের পিতারা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। বাংলাদেশের মাটির কণায় কণায় শহীদের রক্ত মিশে আছে। এই দেশ আমাদের, একাত্তরের পরাজিতদের নয়।’ তিনি আরও বলেন, ইতিহাসকে ‘রিসেট’ করার যে চেষ্টা চলছে, তা কখনোই সফল হবে না। ‘আমি পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার নিয়ম জানি। ইতিহাসকে মুছে ফেলা এত সহজ নয়।’
ড. জাফর ইকবাল বলেন, দেশের নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বিজ্ঞানমনস্কতায় গড়ে তুলতেই তিনি দীর্ঘদিন কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর অনেক শিক্ষার্থী আজ সফল উদ্যোক্তা ও মিলিয়নিয়ার। তাঁদের প্রতি তাঁর আহ্বান, শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়—দেশের জন্যও বিনিয়োগ করতে হবে। ‘আমাদের অনেক টাকার প্রয়োজন। আমরা বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম গড়ে তুলতে শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, যারা বাংলাদেশের ক্ষতি করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে দিতে চেয়েছে, একদিন তাদেরও বিচার হবে।
‘একাত্তরের প্রহরী ফাউন্ডেশন’-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ড. জাফর ইকবাল বলেন, এই সম্মাননা তাঁকে নতুন প্রেরণা দিয়েছে। ‘আমরা যে যেখানে আছি, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যাব।’
সমাপনী বক্তব্যে ড. নুরুন নবী বইমেলা সফল করতে সহযোগিতাকারী গ্র্যান্ড স্পনসর, স্পনসর, লেখক, সাংবাদিক, প্রকাশক, স্বেচ্ছাসেবক ও অংশগ্রহণকারী সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ফোবানা সেন্ট্রাল কমিটির চেয়ারম্যান জাকারিয়া চৌধুরী, যিনি আগামী সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিতব্য ফোবানা সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে ড. জাফর ইকবালকে আমন্ত্রণ জানান। বক্তব্য দেন ২০২৫ সালের নবী-জিনাত সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ডা. সেজান মাহমুদও।
সকাল থেকেই আড্ডা, সাহিত্যচর্চা ও প্রাণবন্ত মিলনমেলায় মুখর ছিল অনুষ্ঠানস্থল। শতাধিক অতিথির উপস্থিতিতে বিকেল তিনটায় আনুষ্ঠানিক পর্ব শেষ হয়।
উল্লেখযোগ্যভাবে, একই দিন নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচও বড় পর্দায় উপভোগ করেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা।
ফকির ইলিয়াস
মন্তব্য করুন: