জামালগঞ্জে মরণনেশা ইয়াবার স্বর্গরাজ্য : অবাধে চলছে মাদক বাণিজ্য

জামালগঞ্জে মরণনেশা ইয়াবার স্বর্গরাজ্য : অবাধে চলছে মাদক বাণিজ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি,জামালগঞ্জ

০৪/০৬/২০২৬ ১৩:২১:১৯

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সুনামগঞ্জ জেলার হাওরবেষ্টিত জামালগঞ্জ উপজেলাটি সাম্প্রতিক সময়ে ধীরে ধীরে মরণনেশা ইয়াবা ও মাদক চোরাচালানের এক অত্যন্ত নিরাপদ ও অপ্রতিরোধ্য স্বর্গরাজ্যে রূপ নিচ্ছে। উপজেলার মোট ছয়টি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জ থেকে শুরু করে হাটবাজারের প্রতিটি আনাচে-কানাচে এখন অবলীলায় ও প্রকাশ্যেই মিলছে যুবসমাজ ধ্বংসকারী এই মরণনেশা ইয়াবা ট্যাবলেট।

অনুসন্ধানী তথ্যে জানা গেছে, বিগত ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাময়িক নড়বড়ে ও পুনর্গঠনকালীন অবস্থানের চরম সুযোগ নিয়ে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিকভাবে সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্র সম্পূর্ণ পরিকল্পিত উপায়ে পুরো জামালগঞ্জ উপজেলায় ইয়াবা বাণিজ্যের এক বিষাক্ত ও অদৃশ্য জাল বিছিয়ে দিয়েছে; বর্তমানে স্কুল-কলেজপড়ুয়া উঠতি বয়সি কিশোর-তরুণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই মরণনেশায় আশঙ্কাজনক হারে জড়িয়ে পড়ছে, যা এই অবহেলিত উপজেলার সামগ্রিক সামাজিক শৃঙ্খলা, পারিবারিক শান্তি ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। সম্প্রতি মাদকের এই ভয়াবহ বিস্তার রোধে উপজেলার বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায় স্থানীয় সুধীসমাজ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে একাধিক জাঁকজমকপূর্ণ মাদকবিরোধী সভা-সমাবেশ, সেমিনার ও সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা।

স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনের এসব সভা-সমাবেশ ও ক্যাম্পেইন কেবল টেবিল-চেয়ারের আনুষ্ঠানিকতা এবং প্রচারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, বাস্তবে মাঠপর্যায়ে ইয়াবা ও মাদকের ওপেন বাণিজ্য থামানোর ক্ষেত্রে এর দৃশ্যমান প্রভাব একেবারেই সামান্য ও নগণ্য।

এলাকাবাসীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জানা গেছে, জামালগঞ্জ থানা পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নিয়মিত ঝটিকা অভিযান চালিয়ে প্রায় প্রতিদিনই একাধিক খুচরা মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠালেও উপজেলার সামগ্রিক পরিস্থিতি কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আজ বিপুল পরিশ্রমে সিন্ডিকেটের একজনকে ধরলে, ঠিক পরদিনই অলৌকিকভাবে তার জায়গায় দুই থেকে তিনজন নতুন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক কারবারি প্রকাশ্যেই গজিয়ে উঠছে, যার মূল কারণ এই অপরাধ সিন্ডিকেটের নেপথ্যে থাকা গডফাদার ও প্রভাবশালী মূল হোতারা সবসময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে ও ধরাশায়ী না হয়ে আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অত্যন্ত অল্প সময়ে, নামমাত্র পুঁজিতে এবং কোনো ধরনের শারীরিক পরিশ্রম ছাড়াই রাতারাতি বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ উপার্জনের চরম প্রলোভনে পড়ে বর্তমানে এলাকার অনেক সাধারণ পেশাজীবী ও দিনমজুরও এই অবৈধ মরণনেশার ব্যবসায় সরাসরি জড়িয়ে পড়ছেন; উপজেলার প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র সাচনা বাজার এলাকার একজন নিয়মিত রিকশাচালক নিজের নাম ও পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখার শর্তে এই প্রতিবেদকের কাছে মাদকের অন্ধকার জগতের এক অবিশ্বাস্য ও গা শিউরে ওঠা চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন।

অসহায়ত্বের সুরে ওই রিকশাচালক প্রতিবেদককে বলেন, “তীব্র রোদ আর বৃষ্টির মধ্যে দিনভর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কষ্ট করে রিকশা চালিয়ে দিনশেষে কয় টাকা আর রোজগার পাই ভাই? চাল-ডাল কিনতেই তো সব শেষ হয়ে যায়; অথচ মাত্র একটা ছোট ইয়াবা বড়ি ওয়ান-টু-ওয়ান হাতবদল করে বিক্রি করতে পারলে অনায়াসে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা নগদ লাভ পকেটে ঢুকে যায়। সারাদিনে মাত্র ৫ থেকে ৬টা ইয়াবা বড়ি বিশ্বস্ত খরিদ্দারের কাছে বিক্রি করতে পারলেই কোনো কষ্ট ছাড়াই অনায়াসে হাজার থেকে বারোশত টাকা পকেটে আসে, এরপর সারাদিন বাজারে রাজা বাবুর মতো আড্ডা দিয়ে রাতে ব্যাগভর্তি দামি বাজার নিয়ে বীরদর্পে বাড়ি ফিরি; মূলত এই কাঁচা টাকার লোভেই আমাদের সাচনা বাজার লাইনের অনেক গরিব রিকশাচালক ও দিনমজুর এখন রিকশা চালানো সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে সরাসরি এই মাদকের অন্ধকার লাইনে নাম লেখাইছে।”

অনুসন্ধানে আরও নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, জামালগঞ্জ উপজেলার বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ি রুট ও নদীপথ ব্যবহার করে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে ইয়াবার বড় বড় চালান জামালগঞ্জে প্রবেশ করছে এবং পরবর্তীতে তা খুচরা বিক্রেতা ও কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে গ্রামগঞ্জ থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে ছাত্রছাত্রীদের টার্গেট করে ছড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয় সচেতন সমাজকর্মীদের মতে, অচিরেই যদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্দেশনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে একটি বিশেষ সাঁড়াশি ‘টাস্কফোর্স’ গঠন করে সীমান্ত ও মাদক স্পটগুলোতে চিরুনি অভিযান চালানো না হয় এবং এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষ যদি দলমত, রাজনীতি ও ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে সরাসরি এই সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে না তোলে, তবে পুরো জামালগঞ্জ উপজেলা অদূর ভবিষ্যতে এক পঙ্গু, মেধাহীন ও পতনোন্মুখ সমাজে পরিণত হওয়া কেউ রুখতে পারবে না।


রকি ইসলাম/এআর

মন্তব্য করুন: