কৈতক ২০ শয্যা হাসপাতালের ভূমিতে ভূমিখেকো চক্রের লোলুপ দৃষ্টি
ছাতক উপজেলার জাউয়া বাজার ইউনিয়নের কৈতক ২০ শয্যা হাসপাতালের দানকৃত ভূমি নিয়ে নতুন করে বিরোধ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালের নামে দান করা জমি অবৈধভাবে বিক্রি ও দখলের চেষ্টা করছে একটি ভূমিখেকো চক্র।
দলিল সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠাকালে ১৯৬১ সালে এলাকার দানশীল ব্যক্তিরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের চিফ মেডিকেল অফিসারের অনুকূলে মোট ২৭ কেদার ভূমি সাব-কবলার মাধ্যমে দান করেন। দলিল নং-৭৯২ অনুযায়ী গোপিকা ভূষণ পুরকায়স্থসহ ১২ জন এবং দলিল নং-৭৯৩ অনুযায়ী তাহির আলীসহ ৬ জন ব্যক্তি মিলিয়ে মোট ১৮ জন দাতা হাসপাতালের নামে ভূমি দান করেন।
বর্তমানে ওই ভূমির ওপর হাসপাতালের বিভিন্ন স্থাপনা, সীমানা প্রাচীর, রাস্তা ও নৌকাঘাট রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে দীর্ঘদিনেও হাসপাতালের নামে জমিগুলো নামজারি বা রেকর্ডভুক্ত করা হয়নি। ফলে জমিগুলো এখনো পূর্ব মালিকদের নামে রয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভূমিদাতা গোপিকা ভূষণ পুরকায়স্থের উত্তরাধিকারীরা পরবর্তীতে হাসপাতালের নামে দান করা জমির অংশ বিশেষ বিক্রি করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, গোপতি প্রিয় পুরকায়স্থ ও গকোলেন্দু পুরকায়স্থ ১৩ আগস্ট ২০১২ তারিখে দলিল নং-৩১৭৯/১২ এর মাধ্যমে পাইগাঁও (বর্তমানে খিদ্রাকাপন) গ্রামের হাজী জফর আলীর ছেলে কবির আহমদের কাছে ৭ শতাংশ জমি বিক্রি করেন। একইভাবে ২৩ আগস্ট ২০১২ তারিখে তাপস পুরকায়স্থ দলিল নং-৩২০৪/১২ এর মাধ্যমে কৈতক গ্রামের মৃত আফিজ আলীর ছেলে নজির আলীর কাছে ৪ শতাংশ জমি বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিক্রিকৃত এসব জমির একটি অংশ হাসপাতালের সীমানা প্রাচীরের ভেতরে এবং প্রায় ২ শতাংশ জমিতে হাসপাতালের প্রবেশপথ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১২ সালে কবির আহমদ হাসপাতালের জমি দখলের চেষ্টা করলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনগণের বাধার মুখে তা ব্যর্থ হয়। পরে ৭ মে ২০২৫ সালে আবারও বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে ভূমি পরীক্ষা (সয়েল টেস্ট) করতে গেলে এলাকাবাসী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাধা প্রদান করেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দানপত্রে বর্ণিত ছয়টি দাগের উত্তর সীমানায় সড়ক ও জনপদ বিভাগের জমি উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির কোনো অস্তিত্ব নেই। তাদের মতে, যাদের কাছ থেকে কবির আহমদ ও নজির আলী জমি ক্রয় করেছেন, তাদের পূর্বসূরিরাই দলিলের মাধ্যমে জমি হাসপাতালের নামে দান করেছিলেন। ফলে বিক্রেতাদের ওই জমিতে কোনো মালিকানা থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
হাসপাতালের জমি দখলের চেষ্টার বিষয়টি এলাকাবাসী সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিনকে অবহিত করলে তিনি সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং বিষয়টি প্রশাসনকে জানান। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ ঘটনার প্রতিবাদে ৮ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে কৈতক ২০ শয্যা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুসরাত আরেফিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এলাকাবাসী হাসপাতালের জমি রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।
পরবর্তীতে ১৫ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে স্থানীয় বাসিন্দারা সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করে অবৈধ নামজারি বাতিল, হাসপাতালের নামে দানকৃত ২৭ কেদার ভূমি নামজারি এবং রেকর্ডভুক্ত করার দাবি জানান।
অন্যদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুসরাত আরেফিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছে নামজারি বাতিলের আবেদন করেন। সূত্র জানায়, সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিষয়টি শুনানির জন্য ৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ নির্ধারণ করেন এবং ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার ও স্থানীয় তহসিল অফিসকে যৌথ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। তবে এখনো সেই প্রতিবেদন জমা না হওয়ায় নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনাও বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালের জমি উদ্ধারের দাবিতে সংবাদ প্রকাশ এবং জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ দেওয়ার জেরে কয়েকজনকে হুমকি-ধামকি ও মিথ্যা মামলায় হয়রানি করা হচ্ছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, জমি দখলে ব্যর্থ হয়ে কবির আহমদ ২৬ মার্চ ২০২৫ তারিখে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় কৈতক গ্রামের সাবেক মেম্বার ও জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি মো. আব্দুর রহিম, সাংবাদিক ও শিক্ষানবিশ আইনজীবী মোহাম্মদ রাজ উদ্দিন, ব্যবসায়ী মো. আশরাফ আহমদ এবং আব্দুর গফুরসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, হাসপাতালের জমি রক্ষায় ভূমিকা রাখার কারণেই তাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে।
কৈতক গ্রামের প্রবীণ মুরব্বি হাজী আব্দুস সোবহান বলেন, “গোপিকা ভূষণ পুরকায়স্থ হাসপাতালের নামে জমি দান করেছিলেন। দানের ৬০ বছর পর তাঁর উত্তরাধিকারীদের সেই জমি বিক্রি করা অত্যন্ত বিস্ময়কর। হাসপাতালের স্থাপনা ও সীমানা প্রাচীর থাকা সত্ত্বেও কীভাবে জমি বিক্রি ও নামজারি হলো, তা তদন্ত হওয়া উচিত।”
হাসপাতালের আরেক দাতা পরিবারের উত্তরাধিকারী ঈমান আলী বলেন, “এই জমি উদ্ধার করা না হলে ভবিষ্যতে অন্য দাতাদের উত্তরাধিকারীরাও একই দাবি তুলতে পারেন। তাই সরকারের উচিত দ্রুত হাসপাতালের জমি রক্ষা করা।”
এ বিষয়ে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুসরাত আরেফিন বলেন, “বিষয়টি সহকারী কমিশনার (ভূমি) দেখছেন। তদন্ত ও পরিমাপ শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে কথিত ভূমিখেকো চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, বিতর্কিত নামজারি বাতিল এবং হাসপাতালের নামে দানকৃত ২৭ কেদার ভূমি রেকর্ডভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে হাসপাতালের মূল্যবান সরকারি ভূমি বেহাত হয়ে যেতে পারে এবং এলাকার পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
সুজন তালুকদার/ তানজুবা তাবাসসুম
মন্তব্য করুন: