সুদীপ চক্রবর্তীর গ্রেফতার ও ন্যায় বিচারের প্রত্যাশা
নবীগঞ্জ জে. কে. উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক তুখোড় মেধাবী ছাত্র এবং সিলেট বিভাগের গৌরব সুদীপ চক্রবর্তী, যিনি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফর্মেন্স স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, তাকে সম্প্রতি আত্মহত্যা প্ররোচনা ধারা ৩০৬–এর একটি মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনাটি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি।
প্রথমত, দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো নাগরিককে হয়রানি না করা—এটি একটি সাংবিধানিক অধিকার এবং ন্যায়বিচারের মূল নীতি। সুদীপ চক্রবর্তীর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হওয়া উচিত নয়। বরং তার সামাজিক ও একাডেমিক অবস্থান, দীর্ঘদিনের গবেষণা-শিক্ষণ, এবং সংস্কৃতিচর্চার ইতিহাস বিবেচনায় তার প্রতি আরও আইনসঙ্গত, শান্ত ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণ প্রাপ্য।
দ্বিতীয়ত, সুদীপ চক্রবর্তীর মতো শান্ত-স্বভাবের, জ্ঞানচর্চায় নিবেদিত একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনা—এটি স্বাভাবিকভাবেই বহু প্রশ্নের জন্ম দেয়। তাকে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ভাবা আমার পক্ষে কঠিন। তার শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও সাংস্কৃতিক মহলের অনেকেই যে বিস্ময় ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, সেটিও এই সন্দেহকে আরও শক্তিশালী করে।
তৃতীয়ত, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও পেশাদার তদন্ত ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা কিংবা গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে তাকে চরিত্রহননের লক্ষ্যবস্তু বানানো—এটি ন্যায়বিচারবিরোধী এবং সভ্য সমাজের পরিপন্থী। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যেভাবে অভিযোগ উঠলেই দ্রুত আটকের প্রবণতা, সামাজিক চাপ, এবং সমন্বিত গণআক্রমণের (mob culture) চর্চা দেখছি—সুদীপ চক্রবর্তীর গ্রেফতার সেই একই ধারার পুনরাবৃত্তির মতো মনে হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের একটি মাষ্টার্সের ছাত্রী মুনিরা মাহজাবিন মিমোর মরদেহ ২৬ এপ্রিল ২০২৬ সকালে রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় তাঁর বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ ও পরিবার সদস্যরা ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে ধরছেন। তখনই মিমোর বাবা বাড্ডা থানায় ‘আত্মহত্যা প্ররোচনা’ মামলাটি দায়ের করেন। সুদীপ চক্রবর্তীকে একমাত্র আসামি করা হয়েছে। পুলিশ তাকে গ্রেফতার দেখিয়েছে।
আমি দৃঢ়ভাবে দাবি করছি—সুদীপ চক্রবর্তীর প্রতি যেন কোনো রকম হয়রানি বা অমর্যাদাকর আচরণ না করা হয়। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সঠিক, নিরপেক্ষ, বৈজ্ঞানিক ও পেশাদার তদন্ত পরিচালনা করা হোক। যদি তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন, তবে তার মর্যাদা, মান-সম্মান ও পেশাগত অবস্থান পুনরুদ্ধারে রাষ্ট্র তার পাশে দাঁড়াবে—এ নিশ্চয়তা দিতে হবে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেভাবে অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত গ্রেফতার ও অপমানজনক আচরণ একটি কালচার হয়ে উঠেছে—রাষ্ট্রকে সেই প্রবণতা থেকে অবিলম্বে সরে আসতে হবে। সুদীপ চক্রবর্তী কেবল নবীগঞ্জ বা সিলেটের গর্বই নন, তিনি বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও একাডেমিয়ার মূল্যবান একটি সম্পদ। তাকে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—তা আমাদের বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও সামাজিক ন্যায়ের ওপর গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
আমি ন্যায়বিচারের পক্ষে, মেধার সুরক্ষার পক্ষে, এবং প্রতিটি নাগরিকের সামাজিক মর্যাদা রক্ষার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান জানাচ্ছি। ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক—হয়রানি নয়, সত্য সামনে আসুক—গুজব নয়।
লেখক
কানাডা প্রবাসী, ছড়াকার ও সাংবাদিক
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: