মন্তব্য প্রতিবেদন
প্রশাসনিক সভায় এমপি–পত্নী: প্রটোকল না প্রভাব?
হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত এক প্রশাসনিক সভায় সংসদ সদস্য রেজা কিবরিয়ার স্ত্রী সিমি কিবরিয়ার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিতি ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি আমন্ত্রণ বা প্রোটোকল–ভুলের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, ক্ষমতার সীমা ও জবাবদিহির কাঠামো সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
প্রথম প্রশ্নটি নীতিগত। সিমি কিবরিয়া কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নন, সরকারি কর্মকর্তা নন, কিংবা সরকার–অনুমোদিত কোনো দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত—এমন তথ্যও প্রকাশ্যে নেই। তিনি একজন সংসদ সদস্যের স্ত্রী—এই পরিচয় ছাড়া তাঁর অন্য কোনো সাংবিধানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান নেই। তাহলে একটি সরকারি প্রশাসনিক সভায় তাঁকে প্রধান অতিথি করার আইনি ভিত্তি কী?
আইনের আলোকে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা
বাংলাদেশের সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “সকল সময়ে জনগণের সেবা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের কর্তব্য।” অর্থাৎ, সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি—কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের প্রতি নয়।
আবার ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের সমতার কথা বলা হয়েছে। যদি কেবল ‘সংসদ সদস্যের স্ত্রী’ পরিচয়ে কেউ প্রশাসনিক সভায় বিশেষ আসন পান, তবে তা কি প্রাতিষ্ঠানিক সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়?
সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি—সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯—এ স্পষ্টভাবে বলা আছে, একজন সরকারি কর্মচারীকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে এবং এমন কোনো কাজ করা যাবে না, যাতে তাঁর নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। একটি সরকারি সভায় অ-সরকারি ও অ-নির্বাচিত ব্যক্তিকে প্রধান অতিথির আসনে বসানো সেই নিরপেক্ষতার ধারণাকে অন্তত বিতর্কিত করে তোলে।
প্রশাসনিক সভার প্রকৃতি
উপজেলা প্রশাসনের সভাগুলো সাধারণত নীতিনির্ধারণ, সমন্বয় ও সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়ন–সংক্রান্ত। এ ধরনের সভায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রোটোকল ও দাপ্তরিক শৃঙ্খলা অনুসরণ করা হয়। প্রশ্ন হলো—উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কোন আইনের বলে একজন এমপির স্ত্রীকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানালেন?
উপজেলা পরিষদ আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় (যেমন উপজেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৮) কোথাও সংসদ সদস্যের পরিবারের সদস্যদের প্রশাসনিক সভায় আনুষ্ঠানিক ভূমিকায় রাখার বিধান নেই। সংসদ সদস্য নিজে অনেক ক্ষেত্রে আমন্ত্রিত বা উপদেষ্টা হিসেবে থাকতে পারেন—কিন্তু তাঁর পরিবারের সদস্যের জন্য আলাদা কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই।
আমন্ত্রণ গ্রহণের নৈতিকতা
প্রশ্ন কেবল আমন্ত্রণের নয়, আমন্ত্রণ গ্রহণেরও। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকলে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক—বিশেষ করে একজন সংসদ সদস্যের পরিবারের সদস্য—এ ধরনের আমন্ত্রণ গ্রহণের আগে ভাবতেন কি না, সেটিও আলোচ্য বিষয়।
কারণ, প্রশাসনিক কাঠামোতে পারিবারিক পরিচয়কে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদায় রূপ দেওয়া হলে তা ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার বা প্রভাব খাটানোর অভিযোগের পথ খুলে দিতে পারে। এমন নজির তৈরি হলে স্থানীয় প্রশাসনে অদৃশ্য চাপ বা অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতার বলয় গড়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে।
বদলি: শাস্তি, না প্রশাসনিক রদবদল?
পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট ইউএনও ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে বদলি করা হয়েছে—যদিও প্রজ্ঞাপনে কারণ উল্লেখ নেই। তাঁদের বদলি হয়েছে সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়–এ। প্রশ্ন হলো, এটি কি নিয়মিত প্রশাসনিক রদবদল, নাকি বিতর্কের প্রতিক্রিয়া?
সরকারি সিদ্ধান্তের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা না থাকলে জনমনে সন্দেহ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। প্রশাসনিক জবাবদিহির স্বার্থে এ ধরনের ঘটনায় সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচিত প্রতিনিধির ক্ষমতা ও প্রশাসনিক কাঠামোর দায়িত্বের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন থাকে। সংসদ সদস্য নীতিনির্ধারণ ও আইন প্রণয়নের অংশ; আর মাঠ প্রশাসন নির্বাহী দায়িত্ব পালন করে। এই সীমারেখা অস্পষ্ট হলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাহুবলের এই ঘটনাটি তাই ব্যক্তি–কেন্দ্রিক নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধতা ও নৈতিক মানদণ্ডের প্রশ্ন। প্রশাসনিক সভা কি ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিসর, নাকি কঠোর প্রটোকল–নির্ভর সরকারি কার্যক্রম—এই মৌলিক প্রশ্নের জবাব স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয় নিয়ম, স্বচ্ছতা ও সমতার ভিত্তিতে। ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও আইনি ভিত্তি ও নৈতিক যুক্তি স্পষ্ট না হলে বিতর্ক অনিবার্য হয়ে ওঠে।
তাহির আহমদ
মন্তব্য করুন: