সদ্য প্রস্ফুটিত একটি গোলাপের প্রয়াণ!
হামে আক্রান্ত হয়ে দেশে প্রথম কোনো হাসপাতালে দায়িত্বরত সেবা দানকারী কারো মৃত্যু ঘটেছে গতকাল। যে মেয়েটি মারা গিয়েছে তার নাম জেরিন সুলতানা। হাসপাতালে সেবা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হতে হয়েছে তাকে। যদিও সে কোনো পেশাগত দায়িত্বে ছিল না। মিডওয়াফারি; তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল। জানিয়ে রাখি, নার্স (সেবক/সেবিকা) বা মিডওয়াইফারিদের শুধু ইন্টার্নশীপে নয়, প্রথম বর্ষের প্রথম ছয় মাস পর থেকেই সপ্তাহে তিন দিন হাসপাতালে ডিউটি (ক্লিনিকাল প্রাক্টিস) করতে হয়। একদিন সাপ্তাহিক ছুটি ব্যতিত বাকি তিন দিন তত্ত্ববিদ্যায় শ্রেণি পাঠগ্রহণে বসতে হয়।
জেরিন সিলেটের একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান থেকে ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করছিল। মিডওয়াইফারি বলতে 'ধাত্রীবিদ্যা' বুঝায়। এটি নার্সিং এরই একটি অপরাপর বিদ্যা। প্রসূতি মা ও শিশুদের নিয়ে যারা বিশেষ ভাবে সেবা দিয়ে থাকেন। সেই হিসেবে লেবার ওয়ার্ড, গাইনী ওয়ার্ড ও শিশু ওয়ার্ডে তাদেরকে ডিউটি করতে হয়। পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে জেরিনকেও মেডিকেলে ডিউটি করতে হয়েছে। সিলেটের একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তার ডিউটির স্থাননির্ণয় ছিল। এবার তাহলে, 'পেশাগত দায়িত্ব ছিল না' কেন বলেছি সে প্রসঙ্গে একটু বলি। এটা ছিল তার শেখার সময়। সরকারি ভাবে বা কোনো বেসরকারি সংস্থা নিযুক্ত সেবা দাতা নয় তারা। তারপরও একজন পেশাগত ভাবেই রোগীর কাছে যেতে হয়। প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ শিখতে হয় তাদেরকে। জেরিন একটি উদাহরণ। হাম মহামারি ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে হাসপাতালে কাজ শিখতে গিয়ে ভাইরাস/রোগে আক্রান্ত হয়ে শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর ইতিহাস রয়েছে।
কেন ঘটছে এমন? যারা রোগ সারাতে সাহায্য করেন, তারাই কেন রেহাই পাচ্ছেন না? হাসপাতালে পেশাগত দায়িত্বে যেসকল ডাক্তার, নার্স (সেবক/সেবিকা) ও মিডওয়াফারি সহ যারা নিযুক্ত আছেন, তাদের সবাইকেই প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। দেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটে হাসপাতাল-ক্লিনিকে উন্নতমানের ব্যবস্থাপনার যথেষ্ট অভাব এবং অনিরাপদ কর্মক্ষেত্র, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি না থাকাও অনেকাংশে দায়ী। তাছাড়া এসব জায়গায় যথাযথ পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব, ওয়ার্ড গুলোতে রুমের ভেন্টিলেটর যথাযথ ভাবে না থাকাও দায়ী রয়েছে। এছাড়াও আরও নানা কারণ রয়েছে, থাকতে পারে। কারণ খোঁজে খোঁজে লিখতে বসলে আরও লেখা যাবে। কেন বলছি এসব কথা? যেখানে পেশাগত দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাই যথাযথ নিরাপত্তা ও নিরাপদে কাজ করার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না, সেখানে শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করবে কে! আশ্চর্যজনক চিহ্ন দিতে হচ্ছে এই পরিতাপ নিয়ে যে প্রশ্ন করব কাকে? করেই বা কতটুকু লাভ হয়েছে, হবে। স্বাস্থ্যখাতে আমাদের প্রচলিত যে ব্যবস্থা, সহজেই যেন এর রেহাই নেই।
আমিই বা কেন এসব লিখতে বসেছি? যদিও কোনো কারণ ছাড়াই এটা নিয়ে লেখা দরকার বোধকরি। হয়তো কেউ না কেউ লিখেছেন বা লিখবেন। কারণ ছাড়া লিখতে গেলেও দুটি কারণ বোধহয় আমার মধ্যে কাজ করছে। জেরিন, আমার গ্রামের বাড়ির পাশের গ্রামের মেয়ে। মাধ্যমিকে একই বিদ্যালয়ে সে আমার জুনিয়র ছিল। তাই কিছুটা চেনাশোনা ছিল। যদিও সে মিডওয়াইফারি নিয়ে পড়তেছে এটা জানা ছিল না, গতকালেই প্রথম জেনেছি। দ্বিতীয় যে কারণ সেটা হচ্ছে, আমি নিজেও বিএসসি ইন নার্সিং নিয়ে পড়াশোনা করছি। তাই রোগীর সেবা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হওয়ার উপাখ্যান সম্পর্কে খুব কাছাকাছি থেকে আমার দেখা-শোনা ও অভিজ্ঞতা আছে কিছুটা হলেও।
সদ্য প্রস্ফুটিত গোলাপ- কেন বলেছি? জেরিন ছিল মিডওয়াইফ। নার্সদের ড্রেসকোড জলপাই, মিডওআইফদের গোলাপী। গোলাপী রঙের পোশাকে, উপমার অর্থে তাদেরকে যদি গোলাপ বলি, আশাকরি খুব একটা ভুল হবে না। জেরিন গোলাপ গুচ্ছের এক হঠাৎই ঝড়ে পড়া গোলাপ। সদ্য প্রস্ফুটিত; এই অর্থে যে, সে সবে শিক্ষার্থী। কর্মজীবনের যাত্রাও শুরু করতে পারেনি। সবে ফুলটি ফুঁটে উঠতে শুরু করেছিল মাত্র। অথচ নিমিষেই ঝড়ে পড়ে গেল সে। তার চির-প্রয়াণে চারপাশে তাকে ঘিরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ভালো থেকো বোন, জেরিন।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: