ভোরে জেগে ওঠা প্রসঙ্গে
মদন মোহন তর্কালংকার ঊনবিংশ শতাব্দির কবি। তাঁর জীবন কাল ১৮১৭ হতে ১৮৫৮ খ্রিঃ পর্যন্ত। তাঁর বিখ্যাত প্রভাত কবিতায় তিনি গেয়েছেন, "পাখিসব করে রব রাতি পোহাইল, কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিল। রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে,-শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে।"
গ্রাম বাংলার প্রাকৃতিক ও সামাজিক অবস্থা কবি তাঁর জীবদ্দশায় এমনটাই দেখেছেন। উক্ত কবিতাংশে কবি চারটি বিষয়ের অবতারণ করেন।
১। প্রভাত পংখিকুল জেগে ওঠে। কূজন করে
২। বৃক্ষ শাখে নবপুষ্প দৃশ্যমান হয়।
৩। কৃষকেরা গরু নিয়ে মাঠে গমন করেন এবং
৪। শিশুরা আপন মনে পড়তে বসে।
ঊনবিংশ শতাব্দির প্রথমার্ধে কবি গ্রাম বাংলার জীবন ধারা তাঁর কবিতায় অত্যন্ত সুন্দর করে উপস্থাপন করেছেন। বিংশ শতাব্দির শেষ দশক পর্যন্ত তাঁর কবিতার বক্তব্যের সাথে গ্রাম বাংলার জীবন ধারার পূর্ণ সামঞ্জস্য বিদ্যমান ছিল। ছোট বেলায় গ্রামীণ জনপদে খুব কাছে থেকে এ দৃশ্য অবলোকন করার সুযোগ হয়েছে অনেকেরই। বিংশ শতাব্দির ৯০'র দশক আমার কিশোর বেলা গ্রামেই কাটিয়েছি। কবির ব্যক্তব্যের পূর্ণ চিত্র গ্রামীণ জনপদে খুঁজে পেয়েছি।
ভোর বেলা। পূর্বাকাশে রক্তিম আভা সূর্যোদয়ের বার্তা বহন করে। পাখিরা জেগে উঠে। ওদের কূজন ভোরের মলয়কে মুখরিত করে তোলে। পাখিরা রাতে যথা সময় ঘুমায় ও ভোরে জেগে ওঠে। বর্ধনশীল উদ্ভিদে দ্রুত কোষ বৃদ্ধি ঘটে। বিশেষ করে পুষ্পে ত্বড়িত কোষ বৃদ্ধি হয়। নিশি ব্যাপী তিলে তিলে বেড়ে ওঠা কুসুমগুলো প্রভাতে দৃশ্যমান হয়। তবে চাষীগণ আগের মতো ভোরে ওঠে গরু নিয়ে মাঠে যাননা। গ্রামে কিংবা শহরে অধিকাংশ লোক দেরিতে ঘুম থেকে ওঠেন। অধিকাংশ শিশু আগেকার দিনের মতো প্রভাতে ঘুম থেকে ওঠে পড়তে বসেনা। উপরোক্ত অভ্যাসদ্বয় আগেকার দিনের চেয়ে বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। গ্রাম বাংলার চিরাচরিত ঐতিহ্য আমরা ক্রমাগত হারাচ্ছি। ভোরে শয্যা ত্যাগের অভ্যাস বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। মানুষ মূল ধারা হতে বিচ্যুত হচ্ছেন। প্রকৃতি ঠিকই আগের মতো রয়েছে।
আজকাল শহরে কিংবা গ্রামে অধিকাংশ লোকের ভোর হয় সকাল দশ-এগারোটায়, এমন কি বারোটায়। রাতে দেরিতে ঘুমানোর কারণে এমনটা হয়। এ দেশে মোবাইল ফোনের প্রচলন হয় ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে। এর পূর্বে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট এর ব্যবহার ছিলোনা। বিনোদন ও খবর শুনার জন্য বেতার ও দূরদর্শন যন্ত্র ছিল ভালো মাধ্যম। রাত ১১.৩০ মিনিটের পর বিটিভি'র অনুষ্ঠান সম্প্রচার বন্ধ হতো। মানুষ স্বভাবতই নিদ্রা যেথেন। বর্তমানে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট এর যুগ চলছে। ২৪ ঘন্টা ফেইসবুক ও ইউটিউব ব্যবহার করা যায়। ভালো ও উপকারী কাজে এ সবের ব্যবহারে আপত্তি নেই। অহেতুক ও অপকারী কাজে এ সবের ব্যবহার ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে ক্ষতি সাধন করে। ফেইসবুক, ইউটিউব ইত্যাদিতে ঢুকলে সময় চলে যায় নীরবে। টের পাওয়া যায়না। রাতে ঘুমানোর পূর্বে এ সবের ব্যবহার নিদ্রাকে বিলম্বিত করে। দেরিতে ঘুম আসে। চোখের ঘুম চলে যায় বহুদূরে। দেরীতে ঘুম থেকে জেগে ওঠার এটা অন্যতম কারণ। বেলা দশ, এগারোটায় বিছানা ত্যাগ করলে আহ্নিক কাজ কর্মের পরিসর সংকুচিত হয়। কর্ম ঘন্টার সঠিক ব্যবহার হয়না। ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে এর ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। এ ধরনের বদঅভ্যাস পরিত্যায্য।
পংখি কুল ও কুসুম কলি স্ব স্ব বৈশিষ্ট্য রক্ষা করে চলেছে। এখনো প্রভাতে পাখিরা জেগে ওঠে ও নবপুষ্প প্রস্ফুটিত হয়। মানুষ আগেকার দিনের মতো ভোরে জেগে ওঠেন না। মানুষ কেন পারবে না? ভোরে ওঠে আমাদের প্রত্যেককে দৈনন্দিন কাজ করা প্রয়োজন। সর্বোপরি রাত দশটার পূর্বে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা বড়ই প্রয়োজন।
লেখক: কলামিস্ট।
তানজুমা তাবাসসুম
মন্তব্য করুন: