তরুণী নিবাস: গাভী বিত্তান্তের অবলম্বনে

তরুণী নিবাস: গাভী বিত্তান্তের অবলম্বনে

মনোয়ার পারভেজ

১২/০৬/২০২৬ ২৩:৪৫:৩০

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

মহাত্মা আহমদ ছফার রচিত একাধিক উপন্যাস সমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি উপন্যাস হচ্ছে 'গাভী বিত্তান্ত', যা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবিক দিক পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে রচিত উপন্যাস বলে স্বীকৃত। এই উপন্যাসটি ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। 'গাভী বিত্তান্ত' উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে উল্লেখ আছে একটি তরুণী নিবাসের কথা। তরুণী নিবাস - নামটি শুনলেই হয়তো মনে হতে পারে এটি কোনো এক রমণী জীবনকথার উপাখ্যান হবে হয়ত অথবা কোনো এক তরুণ রমণীর আবাসন বুঝাতে পারে। কিন্তু আদৌ এটি মূলত তার কিছুই নয়। এখানে 'তরুণী নিবাস' হচ্ছে একটি গাভীর আবাসন। সুতরাং এটি একটি গরুর রচনা ধরা যেতে পারে অথবা বলা যেতে পারে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস চিত্রের খন্ড অংশের বিশেষ উপাখ্যান। যে খন্ড অংশ থেকেই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ দিয়ে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের হালচালের অবস্থা। যে অবস্থার উপাখ্যান কেন্দ্র করে আমাদের মহান কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফা 'গাভী বিত্তান্ত' নামের উপন্যাস হিশেবে রচনা করেছেন। তবে আবার 'গাভী বিত্তান্ত' নাম শুনলেও হয়তো মনে হতে পারে এটার সাথে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক কি হতে পারে? অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে একটি গাভীর আবার কি সম্পর্ক? আসলে সত্যি বলতে এই নাম দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্কের কথা উঠলে মনের গহীনে এমন প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক, যতক্ষণ পর্যন্ত না উপন্যাসটি পাঠ করবেন। এই যে স্বাভাবিক আর অস্বাভাবিক ভাবনার মধ্যে ফেলে দেওয়া, বরং এটাই হচ্ছে এই উপন্যাসে নামের মধ্যে আহমদ ছফার চিন্তাভাবনার উৎকৃষ্ট চমক ও দারুণ সফলতা। মূলত এখানে তরুণী আর গাভী বলতে একই চরিত্রের দুটি নাম। গাভীটিকেই তরুণী নামেই ডাকা হতো। তাই গাভী রাখার জন্য যে আবাসন বানানো হয়েছিল সেটাকেই তরুণী নিবাস নাম দেওয়া হয়েছিল। তারও কিছু কথা, কিছু ইতিহাস আছে অবশ্য। তবে গাভীটির নাম তরুণী এসেছে সেটি হচ্ছে সাভার ডেইরী ফার্মে অস্ট্রেলিয়ান ষাঁড় ও সুইডিশ গাভীর ক্রসে উৎপাদিত; ছিপনৌকার মত গড়ন, সুন্দর চোখ, উন্নত গ্রীবাবিশিষ্ট মোটা তাজা একটি গাভী, যার নাম ছিল 'তরনী'। এখানে গাভীটি যেভাবে চরিত্রের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্যের সময়ের কথা। আর এখানে মূলত গাভীটি এসেছে তৎকালীন একজন উপাচার্যের মাধ্যমেই। সুতরাং এখানে বলা যায় গাভী ও উপাচার্য একে ওপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। উপাখ্যানে যেমন করে গাভীটি এসেছে তার কাহিনি হচ্ছে, ঠিকাদার চরিত্রে থাকা শেখ তবারক আলী উপাচার্যকে হাতে রাখার সন্ধানে এবং আবু জুনায়েদের মনোবাসনা পূর্ণ করতে এই দুর্লভজাতের গাভীটি কিনে দেন এবং উপাচার্যের বাংলোর পিছনের এক স্থানে শেখ তবারক আলী তাঁর নিজ জামাতা বুয়েট পাস সিভিল ইঞ্জিনিয়ার আবেদ হোসেনকে দিয়ে গোয়ালঘর বানিয়ে দেন। পরবর্তীতে দেখা যায় উপাচার্য আবু জুনায়েদের জীবন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ সবটাই হয়ে পড়ে গোয়ালঘরকেন্দ্রিক। আর এই গোয়ালঘরকে কেন্দ্র করেই মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের নানান চিত্র তুলে এনে আহমদ ছফা রচনা করলেন এমন উপন্যাস। আর এভাবে উপন্যাস রচনা করা হয়তো একজন আহমদ ছফা ছিলেন বলেই সম্ভব ছিল। 



এখন আসা যাক মূল প্রসঙ্গে। কাহিনীর মূল প্রেক্ষাপট হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর। যদিও আহমদ ছফা এখানে কোনো সময় বা কাল কিছুই উল্লেখ করেন নি। ঘটনা শুরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচন দিয়ে। এখানে দল বা যিনি নির্বাচিত হবেন সেই দলের উপাচার্য প্যানেলের থেকেই হবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী ভিসি মানে উপাচার্য। এই নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কয়েকটি গ্রুপিং দল অবশ্য আছে। উল্লেখযোগ্য দলগুলো হচ্ছে হলুদ দল, ডোরাকাটা দল, বেগুনি দল ইত্যাদি নামে বিভক্ত। তাদের দলের গ্রুপ গুলো আবার বাংলাদেশের একেকটি রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত বা রাজনৈতিক দলের অনুসারী। সুতরাং বলা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও সেই সময় রাজনীতির দলাদলিতে জড়িত ছিলেন। যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকবে তাদের দলের অনুসারীদের পাল্লাই ভারী থাকবে এটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। সেটাতো বরাবরের কাহিনি এবং সেটাও চোখে পড়েছে আহমদ ছফার। তখনই তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অরাজকতাকে পটভূমি করে স্পষ্টভাষী আহমদ ছফা লিখেছিলেন 'গাভী বিত্তান্ত' উপন্যাস। এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে টেন্ডার বাজি, শিক্ষক প্যানেলের অযৌক্তিক আবদার পূরণসহ অসংখ্য বিষয় গুলো ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরেছেন আহমদ ছফা। তবে একটা বিষয় হচ্ছে উপন্যাসের কোথাও আহমদ ছফা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করেন নি, এবং শিক্ষকদের আসল নামও উল্লেখ করেন নি। তিনি শিক্ষকদের নাম নিজে থেকেই ভিন্ন ভিন্ন নামে চরিত্রের মাধ্যমে এখানে উপস্থাপন করছেন। তবে আহমদ ছফা উপন্যাসটি যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, চরিত্রের কথা গুলো যেভাবে উপস্থাপন করেছেন সেটা দেখলে অবশ্যই বুঝা যায় এটা অবশ্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ও তৎকালীন কোন উপাচার্যের সময়ের লেখা। আহমদ ছফা উপন্যাসটির এক জায়গায় লিখেছেন, "আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টির ছিল গৌরবময় অতীত। অনেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে গোটা দেশের আত্মার সঙ্গে তুলনা করে গর্ববোধ করতেন। এখানে মহান ভাষা আন্দোলন জন্ম নিয়েছে। যুগ যুগ ধরে অবধমিত ইতিহাসের উষ্ণ নিঃশ্বাসের মতো এখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের আগুন সমগ্র ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছে। মুক্তি সংগ্রামের জ্বালামুখ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়।" এটা থেকেই কি অনেকটা আন্দাজ করা যায় না ছফা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলতে চাচ্ছেন? তারপর ছফা আবার বলছেন, "অতীতের গরিমার ভার বইবার ক্ষমতা বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। সাম্প্রতিককালে নানা রোগ ব্যাধি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে কাবু করে ফেলেছে। মাছের পচন যেমন মস্তক থেকে শুরু হয়, তেমনি যাবতীয় অসুখের জীবাণু শিক্ষকদের চিন্তা-চেতনায় সুন্দরভাবে স্থান করে নিয়েছে।" আহমদ ছফা সঠিকভাবেই অনুধাবন করেছেন। কেননা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক গৌরবময় ইতিহাস থাকলেও বর্তমানে সেটা চাপা পড়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানান কর্মকাণ্ডের নিমিত্তে। এখন আর সেই ইতিহাস রচনার কোনো কাজ নেই, ইতিহাসের আলোচনাও নেই। বিপরীতে আলোচনায় আসছে, দায়িত্বশীলদের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দূষিত রাজনীতির কথাবার্তা, নানান অপকর্ম, ছাত্রদের গ্রুপিং নিয়ে মারামারি, শিক্ষকদের নানান গ্রুপ ইত্যাদি ইত্যাদি। এটা আহমদ ছফা তখন যা অনুধাবন করেছেন এতো বছর পেরিয়ে বর্তমান দশকে এসেও বলাচলে প্রায় একই অবস্থা। আর এই অবস্থা ও তৎকালীন একজন অযোগ্য উপাচার্যের কথাই তুলে ধরেছেন আহমদ ছফা এই 'গাভী বিত্তান্ত' উপন্যাসের মধ্যে। আহমদ ছফা উপন্যাসের চরিত্রে উপাচার্যের নাম রেখেছেন মিয়া মুহাম্মদ আবু জুনায়েদ। যিনি ছিলেন রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক। দেখা গেল সবাইকে অবাক করে তিনি সেবার উপাচার্য হয়ে গেলেন। এই বিষয়ে আহমদ ছফা লিখেছেন, "আবু জুনায়েদের উপাচার্য পদে নিয়োগপ্রাপ্তির ঘটনাটি প্রমাণ করে দিল আমাদের এই যুগেও আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ফ্যাকাল্টির সদস্যবৃন্দ আবু জুনায়েদের উপাচার্যের সিংহাসনে আরোহনের ব্যাপারটিকে নতুন বছরের সবচাইতে মড় মজার কান্ড বলে আখ্যা করলেন। আবু জুনায়েদ সয়ং বিস্মিত হয়েছেন বেশি।" সুতরাং আবু জুনায়েদ নিজেও এটা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না বা প্রত্যাশা করেন নি। কিন্তু এসব গ্রুপিং বেড়াজালে, স্বার্থের জন্য দেখা গেল সবই সম্ভব। যেমন উপন্যাসের চরিত্রে থাকা দিলরুবা খানম, যিনি ছিলেন ডোরাকাটা দলের শিক্ষক রাজনীতিতে অতি সক্রিয় রসায়ন বিভাগের সুন্দরী শিক্ষিকা। আবু জুনায়েদের উপাচার্য হওয়ার পিছনে মূলত তাঁরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁরই বুদ্ধিতে ডোরাকাটা দলের সবাই মিয়া মোহাম্মদ আবু জুনায়েদ সাহেবকে নির্বাচনের জন্য মনোনীত করেন। কিন্তু আবু জুনায়েদের বেগম এখানে দিলেন আরেক ব্যাখ্যা। ছফা লিখেছেন, "আবু জুনায়েদের বেগম নুরুন্নাহার বানু খবরটি শোনার পর থেকে আন্ডাপাড়া মুরগির মত চিৎকার করতে থাকলেন। তিনি সকলের কাছে বলি বেড়াতে লাগলেন যে তার ভাগ্যেই আবু জুনায়েদ এমন এক লাফে অত উঁচু জায়গায় উঠতে পারলেন। কিছু মানুষ অভিনন্দন জানাতে আবু জুনায়েদের বাড়িতে এসেছিলেন। নুরুন্নাহার বানু তাদের প্রায় প্রতিজনের কাছে তার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর থেকে কী করে একের পর এক আবু জুনায়েদের ভাগ্যের দুয়ার খুলে যাচ্ছে সে কথা পাঁচ কাহন করে বলেছেন।" আবু জুনায়েদের বেগমের এমন কথা হয়তো বেউ বিশ্বাস করতেন না, শুধু শুধু অগত্যাই শুনতে হত। কেননা আবু জুনায়েদ এমন আসনে বসার জন্য তখনও যোগ্য ছিলেন না। তবে তুলনামূলক সৎ ছিলেন অন্যদের থেকে। কিন্তু দেখা যায় অপেক্ষাকৃত সৎ ও একজন নিরীহ অধ্যাপক থেকে উপাচার্য হওয়ার পর কিভাবে তাঁর ক্ষমতার একরকম অপব্যবহার করতে শুরু করেন তার চিত্র। হাজার অসৎ মানুষের ভীরে তাঁর সততাও একদিকে হারিয়ে যেতে থাকে কালের পরিক্রমায়। তিনি লক্ষ্য করেন তিনি সৎ থাকতে চাইলেও তিনি সৎ থাকতে পারছেন না। তাঁর নিজদলের লোকেরাও যখন সুবিধা আদায় করতে না পেরে তাঁর বিরুদ্ধে চলে যায় তখন তিনি অসহায় হয়ে পড়েন যা সত্যিকার অর্থেই শিক্ষকদের নোংরা রাজনীতিকেই ঈঙ্গিত করে। এবং পাশাপাশি তাঁর দায়িত্বে অবহেলা, অদক্ষতা এবং উদাসীনতার অভাব ছিল না। তিনি তাঁর কাজকর্মে অযোগ্যতার বিষয়টি জানান দিতে থাকলেন। প্রায় সময়ই দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের তাঁর বাসভবনের সামনে আন্দোলন করতে। খুব ছোট ছোট বিষয় নিয়ে গণ্ডগোল থেকে খুনখারাপি পর্যন্ত ঘটতে থাকে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। এই নোংরামি আরো বেশি প্রকাশ পায় যখন দেখা যায় উপাচার্য আবু জুনায়েদ সাহেবের প্রিয় গাভী তরনীকে নিয়ে ক্যাম্পাসে একটা আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এক সময় দেখা যায় কে বা কারা যেন আবু জুনায়েদ সাহেবকে 'গো আচার্য' সম্বোধন করে লিফলেট বিতরণ করে তাঁর বিরুদ্ধে সবাইকে আরো উস্কে দিচ্ছে। তারপর যারা আবু জুনায়েদের বাগানে সন্ধ্যা আড্ডায় আসতেন তারাও পাল্টাপাল্টি লিফলেট বিতরণ করতে শুরু করলেন। কিন্তু এই তরুণী নামের গাভীকে নিয়ে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, উপাচার্যের ঘরেও সমস্যা বাধতে শুরু হলো। গাভীকে নিয়ে সমস্যা তখন ঘরে বাহিরে। উপাচার্যের স্ত্রী তখন এই গাভীকে নিজের সতীনের মত ভাবতে শুরু করলেন। ভাববেন না কেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ বাদে এই গাভীর পিছনেই সবসময় পড়ে থাকেন আবু জুনায়েদ। স্ত্রী-কে, পরিবারকে সময় দেওয়ার সময় তাঁর নেই। এরমধ্যে গাভী ও তরুণী নিবাসের সুবাদে তবারক আলীর জামাতা আবেদ হোসেনের সাথে অবৈধ সম্পর্ক ঘরে উঠে আবু জুনায়েদের ছোট মেয়ের। যা কিনা নুরুন্নাহার বানু নিজ চোখেই দেখেছেন। সেটা দেখার পর নিজেকে কিভাবে শান্ত রাখতে পারেন? উপাচার্য আবু জুনায়েদ পড়ে গেলেন নতুন আরেক জামেলায়। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অযোগ্যতার লক্ষণ, নিয়মে অবহেলা এবং নানান সমস্যা দেখা দিয়েছে, আর অন্যদিকে ঘরে বাধলো নতুন আরেক সমস্যা। তারপর একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে আবু জুনায়েদ সাহেব ঢাকার বাহিরে সফরে গেলে উপাচার্যের বেগম নুরুন্নাহার বানু গাভীটিকে খাবারের সাথে বিষ দিয়ে দেন। গাভীটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। সন্ধ্যায় উপাচার্য সাহেব এসে দেখেন গাভী এই অবস্থা। তারপর একসময় গাভীটি মৃত্যু যন্ত্রণার ভোগান্তি ভোগান্তি পেতে পেতে মারা যায়। আবু জুনায়েদ যে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে অযোগ্য ছিলেন তা নয় বরং স্ত্রীর কাছেও অযোগ্য এবং অবহেলিতও ছিলেন। স্ত্রীর কাছে আবু জুনায়েদের দুর্বলতার অন্যতম একটি ছিল, আবু জুনায়েদ ছাত্রাবস্থায় নুরুন্নাহার বানুর বাবার টাকায় অর্থাৎ তাঁর শশুরের টাকায় পড়াশোনা করেছেন। সে কথা মনে এলেই স্ত্রীর কাছে দুর্বল হয়ে যেতেন তিনি। এছাড়াও আরও অনেক দুর্বলতার কারণও ছিল অবশ্য। উপাচার্য হেরে গেলেন নিজ স্ত্রীর কাছে, হেরে গেলেন তাঁর দায়িত্বের কাছে। 



সুতরাং বলা চলে আহমদ ছফার 'গাভী বিত্তান্ত' উপন্যাসটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নানান প্রেক্ষাপট, বিশেষত বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক রাজনীতির প্রেক্ষাপটের কথা উঠে এসেছে। উঠে এসেছে একজন অযোগ্য উপাচার্যের নানান বিষয়ে অযোগ্যতা, দায়িত্বে অবহেলার চিত্র। যিনি কিনা সুন্দরী শিক্ষিকা দিলরুবা খানম তাঁর নারীপ্রভাবের কাজে ব্যবহৃত হয়ে উপাচার্য প্যানেলে ডুকার সৌভাগ্য পান। তারপর তৎকালীন সরকারের অবাধ্য হবে না বলে তখনকার রাষ্ট্রপতি (যিনি কিনা পদাধিকারবলে দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের দায়িত্বে থাকেন) মিয়া মোহাম্মদ আবু জুনায়েদকেই উপাচার্য হিশেবে নিয়োগ দেন। এই উপাচার্যের পদে আসীন হওয়ার পরে আবু জুনায়েদের চরিত্রের যে পরিবর্তন দেখা দিয়ে থাকে সেটাকে ঘিরেই মূলত ফুটে উঠেছে আহমদ ছফার 'গাভী বিত্তান্ত' উপন্যাসের উপাখ্যান। আর এই উপাখ্যানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা যা উল্লেখ্য আছে তা যখন বর্তমান পরিস্থিতিতেও দুর্নীতি, টেন্ডারবাজী, শিক্ষকদের দলাদলি, কাদা ছোড়াছুড়ি সহ নানান কর্মকাণ্ড টের পাওয়া যায় তখনই আমাদের মনে পড়ে আহমদ ছফার 'গাভী বিত্তান্ত' উপন্যাসটির কথা। এই উপন্যাসটি বর্তমান সমাজ ও জাতীয় শিক্ষার চালচিত্র।

ডি আর ডি

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad