রণক্ষেত্রে পরিণত দুই উপজেলা
লুডু খেলা নিয়ে হবিগঞ্জে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ
হবিগঞ্জে সামান্য লুডু খেলাকে কেন্দ্র করে বড়দের অভ্যন্তরীণ জেদ ও পূর্ববিরোধের জেরে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। জেলার বানিয়াচং ও লাখাই উপজেলায় মাত্র চার দিনের ব্যবধানে পৃথক দুটি সংঘাতের ঘটনায় নারীসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৪০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। সামাজিকভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা এবং পুলিশের সতর্কবার্তার পরও দুই পক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে উন্মত্ত লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ায় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
প্রথম ঘটনাটি ঘটে গত শনিবার (৩০ মে) বিকেলে বানিয়াচং উপজেলার মুরাদপুর গ্রামে। সেখানে কবির মিয়া ও নুর মিয়ার সমর্থকদের মধ্যে লুডু খেলাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। এই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে এর আগেও উভয় পক্ষের মধ্যে একাধিকবার বাকবিতণ্ডা ও চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার বিকেলে দুই পক্ষের লোকজন লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আকস্মিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার এই ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। পরে স্থানীয় মুরব্বিদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে আহতদের উদ্ধার করে বানিয়াচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও হবিগঞ্জ জেলা সদর আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বানিয়াচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ নাজমুল হক জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে এবং এলাকায় নজরদারি জোরদার করে।
বানিয়াচংয়ের এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আজ মঙ্গলবার (২ জুন) সকালে লাখাই উপজেলার মুড়িয়াউক গ্রামে আবারও লুডু খেলাকে কেন্দ্র করে এক বর্বরোচিত সংঘাতের পুনরাবৃত্তি ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই গ্রামের বাসিন্দা বাবুল মিয়া ও আক্তার মিয়া জীবিকার তাগিদে ঢাকায় ফেরি করে মাছ বিক্রি করেন। ঢাকায় থাকাকালীন সময়েই সম্প্রতি তাদের দুই শিশুপুত্রের মধ্যে লুডু খেলা নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয়। পরবর্তীতে শিশুদের সেই তুচ্ছ কোন্দল দুই পরিবারের প্রধানদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে তা চরম মনস্তাত্ত্বিক শত্রুতায় রূপ নেয়। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে ওই দুই পরিবার ঢাকা থেকে নিজ গ্রামে ফিরে এলে অভ্যন্তরীণ এই উত্তেজনা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
এরই জেরে গত সোমবার বিকেলে আক্তার মিয়ার পক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে প্রতিপক্ষের ওপর হামলার প্রস্তুতি নিলে লাখাই থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু পুলিশের সেই কড়া সতর্কবার্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সামাজিক মীমাংসাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আজ মঙ্গলবার সকালে দুই পক্ষের লোকজন পুনরায় লাঠিসোঁটা, ধারালো টেঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে গ্রামের পাশে একটি বোরো জমির খোলা মাঠে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষ একে অপরকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে টেঁটা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করলে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বাবুল মিয়ার পক্ষের ১২ জন এবং আক্তার মিয়ার পক্ষের ৮ জনসহ অন্তত ২০ জন গুরুতর রক্তাক্ত জখম হন।
মুড়িয়াউক ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান মোল্লা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ঢাকায় শিশুদের খেলা নিয়ে বিরোধের পর গ্রামে উত্তেজনা দেখা দিলে স্থানীয় মুরুব্বিদের বিশেষ উদ্যোগে বিষয়টি প্রথমে সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সামাজিক সেই সিদ্ধান্ত অমান্য করে আজ সকালে আক্ষরিক অর্থেই দুই পক্ষ জেদের বশে পুনরায় এই ন্যাক্কারজনক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পরে লাখাই থানা ও দাঙ্গা পুলিশের একটি বিশাল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আহতদের উদ্ধার করে হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতাল এবং লাখাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়েছে। লাখাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুর রহমান জানান, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পূর্ব শত্রুতার জেরে এই মারামারি হয়েছে। বর্তমানে গ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং সংঘর্ষে জড়িত মূল অপরাধীদের গ্রেফতারে পুলিশের বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে।
স্বপন রবি দাস/এআর
মন্তব্য করুন: