নেপথ্যে চাপা পড়া তদন্ত ও শিক্ষক-কোন্দল
সরকারি টাকা ঢেলে নির্মিত জামালগঞ্জ সরকারি কলেজের ছাত্রী হোস্টেল তালাবদ্ধ
সরকারি টাকায় ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল দূরদূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে। থাকার সব আয়োজনই তৈরি, অথচ দেড় বছর ধরে খালি পড়ে আছে চার দেয়াল। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, রহস্যজনকভাবে তদন্ত প্রতিবেদন চেপে রাখা আর আবাসন সুপারের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অনিয়মের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে অচল হয়ে পড়েছে সুনামগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত জামালগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের একমাত্র ছাত্রী হোস্টেলটি।
ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চল থেকে আসা সাধারণ শিক্ষার্থীরা। নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে বাড়তি খরচে মেস বা ভাড়া বাসায় থাকতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ জামালগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজটি ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ও ২০১৮ সালে জাতীয়করণ করা হয়। প্রত্যন্ত এলাকার ছাত্রীদের উচ্চশিক্ষা সহজ করতে কোটি টাকা খরচে নির্মাণ করা হয় নিজস্ব ছাত্রী হোস্টেল। চালুর পর আবাসন সংকট কিছুটা কাটলেও গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা’র পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। ঘটনার পর থেকেই হোস্টেলটি নিয়মিত আবাসিক কার্যক্রমের বাইরে।
ঘটনার পরপরই তৎকালীন হোস্টেল সুপার মুজিবুর রহমানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে দীর্ঘ ১৯ মাস পার হলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি প্রশাসন। কী ঘটেছিল সেদিন? তদন্ত কমিটিই বা কী তথ্য পেল? কেনই বা চেপে রাখা হচ্ছে সেই তদন্ত প্রতিবেদন?—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো জবাব নেই কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী জানান, হোস্টেলে আগের ঘটে যাওয়া ঘটনার পর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। তাদের মধ্যে কাজ করছে ভীতি। মেস বা ভাড়া বাসায় থেকে পড়াশোনা চালাতে গিয়ে পরিবারের ওপর তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ। তারা অনতিবিলম্বে ঘটনার সঠিক তদন্ত প্রকাশ ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে হোস্টেল চালুর দাবি জানান।
এদিকে, অব্যাহতি পাওয়া সাবেক হোস্টেল সুপার মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অনিয়মের অভিযোগ আগুনে ঘি ঢেলেছে। তার বিরুদ্ধে নিয়মিত ক্লাসে না গিয়ে প্রভাব বিস্তার, হোস্টেলের ফি আত্মসাৎ ও যথাযথ হিসাব না দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন সহকর্মীরা।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সাবেক হোস্টেল সুপার মুজিবুর রহমান প্রথম সিলেটকে বলেন, কলেজে আমিই সবচেয়ে বেশি ক্লাস নিই। যারা আমার নামে অপপ্রচার চালাচ্ছে, তারা নিজেরাই নিয়মিত ক্লাস করেন না। অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে তার দাবি-আমি যখন দায়িত্বে ছিলাম, তখন হোস্টেলে তো কোনো ছাত্রীই ছিল না।
কলেজের শিক্ষক পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মো. রফিকুজ্জামান বলেন, "বিগত দিনে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় তদন্ত কমিটি হলেও প্রতিবেদন সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। ঘটনার পর ভয়ে কোনো ছাত্রী উঠে না। প্রতিবেদন প্রকাশের পর অভিভাবক ও ছাত্রীদের নিয়ে সমাবেশ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে হয়তো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।"
তবে পুরো দায় শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতির ওপর চাপিয়ে নিজের হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কাজল চন্দ্র সাহা। তিনি বলেন, "তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আমরা এখনো পাইনি। তবে হোস্টেলে সব সুযোগ-সুবিধা আছে, শিক্ষার্থীরা চাইলেই উঠতে পারে। তবে আগের ঘটনার পর তাদের মধ্যে ভয় কাজ করছে।"
শুধু অবকাঠামো তুলে রাখলেই যে একটি আবাসিক ব্যবস্থা কার্যকর হয় না, অধ্যক্ষের এমন প্রশাসনিক দায়সারা বক্তব্যে সেই প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা। নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুনিশ্চিত না করে শিক্ষার্থীদের ওপর দায় চাপানোকে কলেজের দায়িত্বহীনতা হিসেবেই দেখছেন তারা।
প্রতিবেদন চেপে রাখার বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিল্পী রানী মোদক বলেন, "আমি এখানে যোগদানের পর বিষয়টি জানতে পেরে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রস্তুত করে জেলায় প্রেরণ করেছি।"
তাহলে তদন্ত প্রতিবেদনটি জেলা প্রশাসনে গিয়ে কেন থমকে রইল? এ বিষয়ে জানতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শাকিলা রহমানের সাথে অফিসে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
হাওরাঞ্চলের নারী শিক্ষাকে বেগবান করতে নির্মিত একটি সরকারি অবকাঠামো এভাবে বছরের পর বছর অকার্যকর পড়ে থাকা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, সরকারি অর্থের অপচয়েরও শামিল। অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে এনে অপরাধীদের চিহ্নিত করা এবং নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে হোস্টেলটি চালুর জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ও অভিভাবক মহল।
রকি ইসলাম/ প্রীতম দাস
মন্তব্য করুন: