প্রকৌশলী আলী আকবরকে ঘিরে সিসিকে রাজনীতির ‘রহস্যজনক দাবার চাল’

প্রকৌশলী আলী আকবরকে ঘিরে সিসিকে রাজনীতির ‘রহস্যজনক দাবার চাল’

তাহির আহমদ

২৪/০৯/২০২৬ ২১:৩১:১১

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সরকারে স্বদলীয় হাওয়া, অথচ প্রশাসনে ভিন্ন সুর! রাজনৈতিক অঘটন না বলে এটাকে আর কী-ই বা বলা যায়? বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সিলেট সিটি করপোরেশনে (সিসিক) যখন একের পর এক গুটি চালছে অভিজ্ঞ কর্তারা, ঠিক তখনই ‘উপহার’ হিসেবে এল দূরবর্তী বগুড়ায় বদলির অর্ডার। সিসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবরকে নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী বানিয়ে পাঠানো হয়েছে। গত রোববার তিনি ব্যাগ-বোঁচকা গুটিয়ে নতুন কর্মস্থলের উদ্দেশে সিলেট ত্যাগ করেছেন।


কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—হাসিনা সরকারের দীর্ঘ শাসনামলেও যাকে সরানো যায়নি, স্বদলের সময়ে এসে সেই আলী আকবরকে এমন হুট করে ‘বগুড়া পার’ করা হলো কেন? সিসিকের অন্দরমহলে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে এক প্রচ্ছন্ন ষড়যন্ত্রের গুঞ্জন।


মো. আলী আকবর রাজনীতিতে কোনো নতুন মুখ নন। বুয়েটের শেরে বাংলা হল ছাত্র সংসদের সাবেক এজিএস এবং ১৯৯২-৯৩ সেশনের নির্বাচিত ভিপি তিনি। অথচ নীল দল তথা জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসারী হওয়ার ‘অপরাধে’ ২০০৭ সালে সিসিকে যোগ দিতে গিয়ে তৎকালীন মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের বাধার মুখে পড়েছিলেন। নাটোর পৌরসভা ঘুরে সিসিকে ঢুকলেও বিগত দেড় দশকে পদোন্নতির শিকে ছেঁড়েনি; বরং তাকে রাখা হয়েছিল স্রেফ ‘কোনঠাসা’ করে।


২০১৩ ও ২০১৮ সালে আরিফুল হক চৌধুরী মেয়র থাকাকালে কিছুটা কাজের সুযোগ পেলেও, ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যের আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী মেয়র হয়ে আসার পর ফের ব্যাকবেঞ্চে ঠাঁই হয় আলী আকবরের। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘকালের বঞ্চিত কর্মকর্তারা যখন একটু নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করলেন, তখনই নাটকের মোড় ঘুরতে থাকে।


এর আগে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমানকে প্রেষণে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়। অভিজ্ঞতায় ঝানু নূর আজিজ বিদায় নেওয়ার পর সিসিকের উন্নয়ন কাজের হাল ধরেছিলেন আলী আকবর। বর্তমান সিসিক প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সাথে সমন্বয় রেখে জনবান্ধব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৌড়ঝাঁপও করছিলেন।


কিন্তু হিসাব মিলছিল না এক অদৃশ্য ‘ফ্যাসিস্ট সিন্ডিকেটের’। সিসিকের ভেতরের কিছু পুরনো চালিয়াত কর্মকর্তা, যারা এতদিন আনোয়ারুজ্জামানদের আমলে অর্থ লোপাট ও একছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছিল, তারা দেখল—এই তুখোড় বুয়েটিয়ানকে যদি সিসিক থেকে সরাতে না পারা যায়, তবে তাদের অতীত আমলনামা ফাঁস হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর ওই চক্রের অনেকেই সিসিক থেকে হাওয়া হয়ে গেলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাম-পরিচয় লুকিয়ে অপপ্রচারের ঝড় তোলে। মূল উদ্দেশ্য ছিল একটিই—যেকোনো উপায়ে অভিজ্ঞ ও জাতীয়তাবাদী ঘরানার কর্মকর্তাদের বিতর্কিত করা, যাতে তারা মন বল হারিয়ে সিসিক ছাড়েন। আর সেই সুযোগে নবাগতদের এনে নতুন ‘সিন্ডিকেট’ বানিয়ে নিজেদের গা বাঁচানো যায়।


চক্রটির এই ‘চাচা আপন জান বাঁচা’ মিশন শেষ পর্যন্ত আপাতত সফল! আলী আকবরকে বগুড়ায় পাঠিয়ে এখন সিসিককে একপ্রকার ‘অভিজ্ঞতাহীন’ করার রাস্তা পরিষ্কার হলো। চতুর এই চক্রের নজর এখন বিএনপির নতুন সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা থমকে দেওয়া, যাতে দিনশেষে পুরো দায় গিয়ে পড়ে সিসিকের নতুন প্রশাসনের ঘাড়ে।


সিসিক ঘিরে এই যে ‘খোলস পাল্টানো’ রাজনীতির দাবার চাল চালছে অদৃশ্য হাতগুলো, তা সময়মতো ধরে ফেলবে সিসিক প্রশাসন, নাকি ‘বগুড়ার বাতাস’ গায়ে লাগিয়ে আরও কিছু কর্মকর্তা একের পর এক বিদায় নেবেন—এখন সেটাই দেখার বিষয়!

নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad