দরগাহের সম্পত্তি ও কবরস্থান দখল
কার স্বার্থে আড়ালে থাকছে শাহপরান (রহ.) ওয়াক্ফ এস্টেটের অনিয়ম?
সিলেটের আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হযরত শাহপরান (রহ.) ওয়াক্ফ এস্টেট (ইসি নং-১৩৬৫১)। প্রতিবছর লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষের দান-অনুদান এবং কোটি কোটি টাকার ওয়াক্ফ সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে এক রহস্যজনক পরিচালনা বলয়। প্রশ্ন উঠেছে ওয়াক্ফ সম্পত্তির আয়-ব্যয়, স্বজনপ্রীতি, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং কবরস্থানের জমি দখলের মতো গুরুতর বিষয়ে। এবার ১৯৭৭ সালের ঐতিহাসিক সরকারি সনদ, ফাইলবন্দি হওয়া পুরনো তদন্ত রিপোর্ট এবং সম্প্রতি জেলা প্রশাসন ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনে দাখিল করা ৩২৬ পৃষ্ঠার বিস্ফোরক নথিপত্রকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে অনুসন্ধান।
কী ঘটছে হযরত শাহপরান (রহ.) ওয়াক্ফ এস্টেটে? এটি কি নিছকই প্রশাসনিক অবহেলা, নাকি আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠানের আড়ালে চলছে কোনো সিন্ডিকেটের স্বার্থরক্ষা? আমাদের অনুসন্ধান তুলে ধরছে ঘটনার ভেতরের ঘটনা।
হারিয়ে যাওয়া ১৯৭৭-এর সনদ: কীভাবে বদলে গেল পরিচালনা পর্ষদ?
বাংলাদেশ ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত ১৯৭৭ সালের অনুমোদিত কমিটির তিন পৃষ্ঠার একটি সার্টিফাইড কপি অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ওই দলিলে দেখা যায়, তৎকালীন ৪ নম্বর খাদিমপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ ১১ সদস্যের একটি বৈধ কমিটি ওয়াকফ এস্টেটের দায়িত্বে ছিলেন।
স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, ১৯৭৭ সালের অনুমোদিত সেই কমিটির পর পরবর্তী সময়ে কোন আইনি প্রক্রিয়ায় এবং কীভাবে নতুন কমিটিগুলো গঠিত হলো? স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও সরকারি অনুমোদন ছাড়া কীভাবে বছরের পর বছর পরিচালনা পর্ষদের রদবদল ঘটেছে? সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর বৈধতার সপক্ষে ওয়াক্ফ এস্টেট বা প্রশাসকের কার্যালয়ে কোনো সঠিক নথি রক্ষিত আছে কি?
২০২০ সালের তদন্ত ফাইলবন্দি: আড়ালে কোন অদৃশ্য শক্তি?
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২০ সালের ২০ মে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের পক্ষ থেকে দরগাহের নানা অনিয়ম নিয়ে সিলেট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়। একই দিনে (স্মারক নং-৩৫০) অভিযোগটি তদন্তের জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সিলেটে পাঠানো হয়। দীর্ঘ তদন্তের পর ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ইসলামিক ফাউন্ডেশন তাদের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।
কিন্তু রহস্যজনকভাবে সেই তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশসমূহ গত ছয় বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। অভিযোগকারীদের দাবি, পূর্ববর্তী তদন্তের সুপারিশগুলো রাজনৈতিক প্রভাব বা কোনো স্বার্থান্বেষী মহল চেপে রেখেছে। সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের তদন্ত রিপোর্ট কেন বাস্তবায়ন করা হলো না—তা নিয়ে জনমনে নানা ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে।
মাজার বনাম মাজার: জমি ও পবিত্র কবরস্থান দখল ঘিরে নানা প্রশ্ন
শাহপরান (রহ.) দরগাহ ও ওয়াক্ফ এস্টেটের নিজস্ব জমির সীমানা এবং মূল কবরস্থান ঘিরে একের পর এক বিতর্কিত স্থাপনা ও নামসর্বস্ব মাজার গজিয়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, সোনা মিয়া, ফজলু মিয়া, তোতা পাগলা, কামাল মিয়া এবং ফরিদ মিয়া—এই ধরনের বিভিন্ন ব্যক্তির নামে মূল দরগাহ প্রাঙ্গণ ও কবরস্থানের জমিতে তৈরি করা হয়েছে নানা কাঠামো।
৩২৬ পৃষ্ঠার বিস্ফোরক নথি ও সাম্প্রতিক প্রশাসনিক নড়াচড়া
সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ এ ঘটনার মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিয়েছে। দরগাহ পরিচালনার নানা অনিয়ম, সম্পত্তির হিসেব ও কমিটির অসংগতির পক্ষে মোট ৩২৬ পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ প্রামাণ্য নথিপত্র জমা দেওয়া হয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে। পাশাপাশি, গত ১২ অক্টোবর (২০২৬) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ডকেট নং-১৮৪৯-এর মাধ্যমে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা পড়ে। এর পরদিনই ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সিলেটের পক্ষ থেকে গত ১৯ অক্টোবর (২০২৬) মোতাওয়াল্লির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্তে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা অন্তর্ভুক্ত করে একটি কমিটি গঠনের চিঠি দেওয়া হয়।
তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিযোগকারীদের শঙ্কা, এই নতুন পদক্ষেপ যেন পূর্বের মতো কেবল ‘চিঠিপত্র চালাচালি’ ও ফাইলবন্দি প্রক্রিয়ার মধ্যে আটকে না পড়ে। জেলা প্রশাসক (সিলেট), বাংলাদেশ ওয়াক্ফ প্রশাসক এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কাছে সাধারণ মানুষের আহ্বান—আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দলিলের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এসব অনিয়মের জট উন্মোচন করা হোক।
নীরব চাকলাদার/ তাহির আহমদ/ প্রসি-২০২৬
মন্তব্য করুন: