পূজা এলেই বোঝা বাড়ে যাদের...
চারিদিকে যখন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজার ঢাকের বাদ্য, আনন্দের সুর আর আলোকের রোশনাই, ঠিক তখনই মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের মিরতিংগা চা-বাগানে বাজছে বাঁচার আকুতি আর ক্ষোভের সুর। আনন্দ যেখানে প্রতিটা ঘরে ঘরে কড়া নাড়ার কথা, সেখানে চা-শ্রমিকদের ঘরে উৎসবের বার্তা নিয়ে আসে কেবলই অনিশ্চয়তা ও ঋণের বোঝা।
“রুটি-রুজির সংগ্রাম চলছে, চলবে!”, “বেতন-বোনাস নিয়ে টালবাহানা সইব না!”— এমন সব হৃদয়বিদারক আর ক্ষুব্ধ স্লোগানে বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকাল ৯টা থেকে কাজ বন্ধ রেখে রাজপথে নেমেছেন মিরতিংগা চা-বাগানের ১ হাজার ১৭ জন খেটে খাওয়া শ্রমিক। কাজের হাতিয়ার রেখে হাত উঁচিয়ে বোনাসের দাবিতে তারা শুরু করেছেন অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ কর্মসূচি।
বাগান সূত্রের অভিযোগ, শত কষ্ট সত্ত্বেও উৎসবের মুখ চেয়ে সারা বছর হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন এই সবুজ পাতার কারিগররা। অন্যান্য বছর পূজার আগে অন্তত ৬০ শতাংশ বোনাস পেলেও, এবার বাগান কর্তৃপক্ষ হঠাৎ করেই তা কমিয়ে ৩০ শতাংশ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পূজার মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকলেও এখনও মেলেনি এক সপ্তাহের বকেয়া মজুরি। বোনাস অর্ধেক করে দেওয়ার এই সিদ্ধান্তে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হতদরিদ্র শ্রমিক পরিবারগুলো।
চোখের জল মুছতে মুছতে রিতা পাইনকা, আলন্তী উরাং আর লেবুলাল বাউরী বলেন, “বছরের পর বছর আমরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে বাগানকে সবুজ রাখি। উৎসবের দিন দুটো ডাল-ভাত আর সন্তানের মুখে একটু নতুন জামা তুলে দেওয়ার যে স্বপ্ন দেখি, সেটাও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। বাগানে যখন কোনো লোকসান নেই, তখন আমাদের পেটে কেন লাথি মারা হচ্ছে?”
একই সুর মানিক প্রসাদ ও সুমন কুর্মীর কণ্ঠেও। তাদের স্পষ্ট বার্তা— আজকের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বোনাস না দিলে তারা কাজ ছেড়ে রাজপথেই অবস্থান নেবেন।
মিরতিংগা চা-বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সাবেক সভাপতি নিরঞ্জন তন্তবায় ও বর্তমান সভাপতি মন্টু অলমিক আক্ষেপ করে বলেন, “আশপাশের সব চা-বাগানের শ্রমিকরা সময়মতো বেতন-বোনাস পেয়ে কেনাকাটা করছে, পূজার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথচ মিরতিংগার শ্রমিকদের ঘরে আজ হাঁড়ি চড়াই কঠিন। দ্রুত আমাদের পাওনা পরিশোধ না করা হলে আন্দোলন আরও তীব্র ও কঠোর থেকে কঠোরতর হবে।”
শ্রমিকদের এই আবেগ ও কষ্টের কথা স্বীকার করে মিরতিংগা চা-বাগানের ব্যবস্থাপক রেজাউল হায়াত খান (ইমন) বলেন, “শ্রমিকদের দাবি শতভাগ যৌক্তিক। কিন্তু ব্যাংক থেকে প্রত্যাশিত ঋণ না পাওয়ার কারণে আমরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছি। বাধ্য হয়ে আমরা আপাতত ৩০ শতাংশ বোনাস দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলাম, যা শ্রমিকরা প্রত্যাখান করেছেন। আমরা বিকল্প সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছি।”
উৎসব আসে, আলো ফোটে শহর থেকে গ্রামে। কিন্তু মিরতিংগার এই এক হাজার সতেরোটি পরিবার জানে— পূজা এলেই আনন্দের বদলে তাদের কাঁধে বাড়ে ঋণের বোঝা আর পেটের ক্ষুধা সামলানোর কঠিন যুদ্ধ। রাজপথের এই প্রতিবাদ কেবল টাকার দাবি নয়, এটি অবহেলিত এক মানবজাতির আত্মসম্মান ও উৎসবে বাঁচার আকুল আকুতি।
নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬
মন্তব্য করুন: