শাহপরান (রহ.) দরগাহ ওয়াকফ এস্টেটের তদন্তে লিখিত বক্তব্য ও নথিপত্র দাখিল
হযরত শাহপরান (রহ.) দরগাহ ওয়াকফ এস্টেট (ইসি নং-১৩৬৫১)-এর বর্তমান মোতওয়াল্লীর দায়িত্ব পালন, ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, আয়-ব্যয় ও দান-অনুদানসহ বিভিন্ন বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্তে লিখিত বক্তব্য, প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও প্রমাণাদি দাখিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে এস্টেটের সুষ্ঠু ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ২৫ সদস্যের পরিচালনা কমিটির স্থানীয় সদস্যরাও তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে তাঁদের বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় কার্যালয়, পূর্ব শাহী ঈদগাহ, সিলেটে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মো. আমিরুল ইসলাম তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে এসব লিখিত বক্তব্য, নথিপত্র ও তথ্য-প্রমাণ দাখিল করেন।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সিলেটের ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের তদন্ত-সংক্রান্ত নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে এসব তথ্য ও নথি উপস্থাপন করা হয়। ওই নোটিশে হযরত শাহপরান (রহ.) ওয়াকফ এস্টেটের বর্তমান মোতওয়াল্লীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথি ও প্রমাণসহ উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানানো হয়েছিল।
দাখিল করা লিখিত বক্তব্যে বর্তমান মোতওয়াল্লী সৈয়দ মামুনুর রশিদের নিয়োগ ও দায়িত্ব পালনের আইনগত ভিত্তি, নিয়োগের মূল আদেশ, মেয়াদ, অনুমোদন, নবায়ন এবং দায়িত্ব পরিবর্তন বা পদত্যাগ-সংক্রান্ত কোনো নথি থাকলে তা যাচাইয়ের অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারি তদন্ত, জেলা প্রশাসন ও ওয়াকফ প্রশাসনের বিভিন্ন নথি, আদেশ, স্মারক, তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট আইনগত মতামত পর্যালোচনা করে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার আবেদন করা হয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ তারিখের একটি কথিত পদত্যাগপত্র বা নথির বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। নথিটির মূল উৎস, সত্যতা, স্বাক্ষর ও তারিখ এবং পরবর্তী প্রশাসনিক বা আইনগত কার্যক্রমে এর কোনো প্রভাব রয়েছে কি না, তা মূল রেকর্ডের মাধ্যমে যাচাইয়ের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এস্টেটের আর্থিক কার্যক্রম যাচাইয়ের জন্য ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ক্যাশবুক, লেজার, আয়-ব্যয়ের রেজিস্টার, রসিদ বই, দান-অনুদানের হিসাব, মানত-নজরানা, দোকান ও স্থাপনার ভাড়া-ইজারাসহ অন্যান্য আয়ের উৎসের নথি পরীক্ষা করার আবেদন করা হয়েছে। পাশাপাশি দানবাক্সের সংখ্যা ও অবস্থান, সিল ও চাবি সংরক্ষণ, দানবাক্স খোলা, অর্থ গণনা, ব্যাংকে জমা এবং সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার ও রসিদ যাচাইয়ের অনুরোধ করা হয়েছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সময়ের সিসিটিভি ফুটেজসহ অন্যান্য আর্থিক ও ডিজিটাল রেকর্ড পর্যালোচনার কথাও বলা হয়েছে।
ওয়াকফ এস্টেটের জমি, দোকান, ভবন ও অন্যান্য সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করে সরকারি ভূমি রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার আবেদনও করা হয়েছে। কোনো সম্পত্তি যথাযথ অনুমোদন ছাড়া ব্যবহার, দখল, নির্মাণ, ভাড়া, ইজারা বা অন্য কোনোভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে কি না, তা সরকারি নথি ও তদন্তের মাধ্যমে যাচাইয়ের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া ওয়াকফ এস্টেটের ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদ ও ভিডিও প্রতিবেদনও তদন্তের আওতায় আনার অনুরোধ করা হয়েছে। তবে এসব সংবাদ বা ভিডিওতে প্রকাশিত বক্তব্যকে সরাসরি প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা না করে মূল ভিডিও, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, সরকারি নথি এবং অন্যান্য গ্রহণযোগ্য তথ্য-প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করার আবেদন জানানো হয়েছে।
লিখিত বক্তব্য ও নথিপত্র দাখিলের সময় ওয়াকফ এস্টেটের সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ২৫ সদস্যবিশিষ্ট পরিচালনা কমিটির স্থানীয় সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা প্রস্তাবিত কমিটি, এস্টেটের ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয়ভাবে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের নিজ নিজ বক্তব্য তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে উপস্থাপন করেন। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত কমিটির বিষয়ে তাঁদের মতামত ও সম্মতির বিষয়ও তুলে ধরা হয়।
এস্টেটের সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমুখী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ২৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিচালনা কমিটি গঠনের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় জেলা প্রশাসক, সিলেটকে সভাপতি এবং পুলিশ কমিশনার, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশকে সহ-সভাপতি করার প্রস্তাবসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। তবে কমিটির চূড়ান্ত গঠন, সদস্য মনোনয়ন ও অনুমোদন প্রচলিত আইন, ওয়াকফ বিধি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত ক্ষমতা এবং তদন্তের ফলাফলের আলোকে নির্ধারণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, উপস্থাপিত অভিযোগ ও তথ্যগুলো তদন্তাধীন বিষয়। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হিসেবে বিবেচনা না করে মূল নথি, সরকারি রেকর্ড, হিসাবপত্র, সাক্ষ্য, তদন্ত এবং অন্যান্য গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়গুলো যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বর্তমান মোতওয়াল্লীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে বক্তব্য ও ব্যাখ্যা দেওয়ার যথাযথ সুযোগ দিয়ে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত সম্পন্ন করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তদন্তে কোনো অভিযোগ বা অনিয়ম নির্ভরযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত ক্ষমতা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করার আবেদনও জানানো হয়েছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের নোটিশ অনুযায়ী ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১১টায় প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণসহ উপস্থিত হওয়ার নির্দেশনা ছিল। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হয়ে লিখিত বক্তব্য, নথিপত্র ও প্রমাণাদি দাখিল করা হয় এবং প্রস্তাবিত পরিচালনা কমিটির স্থানীয় সদস্যরা তাঁদের নিজ নিজ বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
তবে দাখিল করা অভিযোগ ও তথ্যের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনগত দায়-দায়িত্ব এখনো তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়নি। বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই ও তদন্তাধীন রয়েছে।
নীরব চাকলাদার/ রত্না বাউরী/প্রসি-২৬
মন্তব্য করুন: