দোয়ারাবাজারে চেলা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন: বহাল তবিয়তে প্রভাবশালীরা

হয়রানির শিকার শিক্ষক ও প্রবীণেরা

দোয়ারাবাজারে চেলা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন: বহাল তবিয়তে প্রভাবশালীরা

নিজস্ব প্রতিনিধি, দোয়ারাবাজার

১৪/১০/২০২৬ ২১:৩৩:০৫

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার চেলা নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। অভিযোগ উঠেছে, এক প্রভাবশালী সর্বদলীয় সিন্ডিকেট স্থানীয় প্রশাসনের অসাধু কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে নদী ধ্বংস করে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালু লুটপাট করছে। মাঝেমধ্যে লোকদেখানো অভিযানে দু-একজন শ্রমিক আটক হলেও অধরাই থেকে যাচ্ছে মূল কারিগররা। উল্টো বালু খেকো চক্রের ইশারায় মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বালু উত্তোলনবিরোধী আন্দোলনকারী, শিক্ষক ও স্থানীয় নিরীহ বাসিন্দাদের। ফলে প্রশাসনের পরিচালিত এসব অভিযান ও মামলার কার্যকরিতা নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চেলা নদীর সোনাপুর ও পূর্ব-সোনাপুর (মরা চেলা) এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের তোয়াক্কা না করে দিনরাত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। সম্প্রতি গত ৬ সেপ্টেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জের সহকারী পরিচালক মো. মুহাইমিনুল হক বাদী হয়ে ৩৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ১০-১৫ জনকে আসামী করে দোয়ারাবাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের দাবি, সরেজমিনে তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়ায় এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবে স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ ভিন্ন। তাদের দাবি, নদীর ইজারাদারের মদদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পদধারী নেতা ও স্থানীয় কয়েকটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট চেলা নদীর পাড় কেটে কোটি কোটি টাকার বালু লুট করছে। এর প্রতিবাদে এলাকাবাসী বিভিন্ন সময়ে বিক্ষোভ ও কর্মসূচি পালন করলে সাময়িকভাবে প্রশাসনের টনক নড়ে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অভিযানের পর বালু খেকো চক্রের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হয়। এতে মূল অপরাধীরা আড়ালে থেকে যায় এবং শিক্ষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ বাসিন্দাদের আসামী বানিয়ে হয়রানি করা হয়।

মামলায় আসামী হওয়া সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় এক মাদ্রাসার শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শিক্ষকতার পাশাপাশি আমি বাজারে ছোট একটি ফার্মেসি পরিচালনা করি। নদীর বালু উত্তোলনের সাথে আমার বা আমার পরিবারের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ আমাকে পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলায় আসামী করা হয়েছে। মূলত প্রতিবাদ বন্ধ করতেই আমাদের নাম দেওয়া হয়েছে।”

একই গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা জহুর মিয়া জানান, মামলার অধিকাংশ আসামীই নির্দোষ। চতুর বালু চক্রটি নিরপরাধ মানুষদের আসামী করিয়ে তাদের চাপে রেখে নিজেদের অবৈধ ব্যবসা নির্ঝঞ্ঝাটভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি অবিলম্বে এসব ভুয়া মামলা থেকে নির্দোষদের অব্যাহতি এবং মূল হোতাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সোনাপুর ও পূর্ব সোনাপুর এলাকায় কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও ছাত্রদলের কিছু পদধারী নেতা এই বালু লুটের নিয়ন্ত্রণ করছেন। অভিযুক্তদের মধ্যে ছাতক ও কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার কতিপয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধির নাম উঠে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন নদী থেকে উত্তোলিত বালু কয়েক কিলোমিটার দূরে বড় আকারের বাল্কহেড বা ডাম্পিং পয়েন্টে স্তূপ করে রাখা হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই বিশাল ডাম্পিং পয়েন্টগুলোতে প্রশাসন কোনো অভিযান চালায় না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, প্রশাসনের অভিযানের তথ্য আগেই সিন্ডিকেটের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে মূল হোতারা সটকে পড়ে এবং নদী থেকে কেবল খেটে খাওয়া শ্রমিকদের আটক করা হয়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আসামী তালিকায় নাম থাকা উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুবুল হক শামিম দাবি করেন, “আমি শুরু থেকেই এই অবৈধ বালু উত্তোলনের তীব্র বিরোধিতা করে আসছি। চক্রান্ত করে আমাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করতে আসামী করা হয়েছে।” তবে অভিযুক্ত অন্য রাজনৈতিক নেতাদের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি।

আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জের সহকারী পরিচালক মুহাইমিনুল হক জানান, “স্থানীয়দের প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে সরেজমিন পরিদর্শন করেই মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। তবে তদন্ত সাপেক্ষে যদি নির্দোষ কেউ আসামী হয়ে থাকেন এবং প্রকৃত বালু খেকোদের নাম বাদ পড়ে থাকে, তবে চার্জশিটে প্রকৃত অপরাধীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে।”

এদিকে চেলা নদী ও আশেপাশের পরিবেশ রক্ষায় কেবল শ্রমিকদের গ্রেপ্তার না করে, এই চক্রের অর্থায়নকারী, নেপথ্যের নিয়ন্ত্রক ও বালু মজুত করার ডাম্পিং পয়েন্টগুলোতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

মাসুদ রানা সোহাগ / নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad