শাহপরান মাজারে মোতাওয়াল্লী সিন্ডিকেটের হরিলুট: প্রতিকার দাবিতে ডিসির কাছে স্মারকলিপি
সিলেটের পুণ্যভূমি হযরত শাহপরান (রহ.) মাজার দরগাহ ওয়াকফ এস্টেটে (ইসি নং-১৩৬৫১) দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত চরম আর্থিক অনিয়ম, দানবাক্সের অর্থ লুটপাট এবং বিপুল সম্পত্তি আত্মসাতের মহোৎসবের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে রাজপথে নেমেছেন স্থানীয় সচেতন জনতা। বিতর্কিত মোতাওয়াল্লী সৈয়দ মামুনুর রশিদ ও তার মদদপুষ্ট লুটেরা সিন্ডিকেটের সীমাহীন দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলতে এবার সরাসরি ময়দানে নেমেছেন এলাকাবাসী ও যুবসমাজ। চলমান সরকারি তদন্তের অংশ হিসেবে মাজারের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি রক্ষা, স্বচ্ছতা আনয়ন এবং প্রশাসনিক কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ওয়াকফ উন্নয়ন কমিটির সভাপতি বরাবর ১১ দফার এক বিস্ফোরক আবেদন দাখিল করা হয়েছে।
আবেদনপত্র ও দাপ্তরিক নথিসূত্রে জানা গেছে, ওয়াকফ প্রশাসন ঢাকা থেকে ইতিপূর্বে দুটি পৃথক স্মারকে (২৭/০৯/২০২৬ ও ১৬/০৭/২০২৬ খ্রি.) মাজারের অনিয়ম প্রতিরোধ ও সম্পদ সুরক্ষায় কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর সিলেট বিভাগীয় ইসলামিক ফাউন্ডেশনে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ শুনানিতে বাদীপক্ষ ও প্রস্তাবিত পরিচালনা কমিটির সদস্যরা সশরীরে উপস্থিত হয়ে মোতাওয়াল্লী সিন্ডিকেটের দুর্নীতি ও লুটপাটের পক্ষে মোট ৩২৬ ফর্দের (পৃষ্ঠার) এক বিশাল ও অকাট্য প্রমাণাদি দাখিল করেন।
অভিযোগকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রতিদিন দেশ-বিদেশের হাজার হাজার ভক্তের দেওয়া কোটি কোটি টাকার দান এবং মাজারের নিজস্ব সম্পত্তি থেকে আসা বিপুল আয় পরিকল্পিতভাবে গোপন করা হচ্ছে। ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে এই বিতর্কিত মোতাওয়াল্লী সিন্ডিকেট মাত্র ৫৪ লক্ষ টাকার একটি কাল্পনিক, সাজানো ও বানোয়াট হিসাব দেখিয়েছে—যা প্রকৃত আয়ের তুলনায় স্রেফ লোকদেখানো এবং শুভঙ্করের ফাঁকি ছাড়া আর কিছুই নয়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাটের আসল রহস্য উন্মোচনে মাজারের ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, জমা-উত্তোলনের তথ্য, ক্যাশ বুক, লেজার বুক ও ব্যয়ের ভাউচার পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করতে একটি উচ্চতর নিরপেক্ষ ফরেনসিক অডিট সম্পন্ন করার জন্য জেলা প্রশাসকের নিকট জোরালো দাবি জানানো হয়েছে।
পবিত্র মাজারের মর্যাদা ও সম্পত্তি রক্ষায় এলাকাবাসী দাখিলকৃত আবেদনে ১১টি সুনির্দিষ্ট ও কড়া সুপারিশ তুলে ধরেছেন। তারা অবিলম্বে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (এডিসি) প্রধান করে এবং একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, স্থানীয় সহকারী কমিশনার (ভূমি), ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ওয়াকফ পরিদর্শক ও হিসাব নিরীক্ষা দপ্তরের উপযুক্ত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সর্বজনগ্রাহ্য উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের আহ্বান জানান। একই সাথে তদন্ত চলাকালে মাজারের ব্যাংক হিসাব, রসিদ বই, দানবাক্সের হিসাব ও ভূমির দলিলসহ যাবতীয় মূল নথিপত্র আইনানুগভাবে বাজেয়াপ্ত বা সিলগালা করার দাবি জানানো হয়। দানবাক্স খোলা ও অর্থ গণনার সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি এবং ভিডিও রেকর্ড নিশ্চিত করার পাশাপাশি মাজারের সকল জমি ও ইজারার রেকর্ড সরজমিনে মূল দলিলের সাথে মিলিয়ে দেখার জোর দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া মাজারের চলমান অরাজকতা দূর করতে সিলেটের জেলা প্রশাসককে সভাপতি ও মহানগর পুলিশ কমিশনারকে সহ-সভাপতি করে পূর্বে দাখিলকৃত ২৫ সদস্যের অ্যাডহক পরিচালনা কমিটি দ্রুত অনুমোদনের দাবি জানান তারা।
আবেদনকারীরা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, তারা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে বেআইনি আক্রোশ থেকে নয়; বরং পবিত্র মাজারের সম্পত্তি রক্ষা ও পূর্ণ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই এই প্রশাসনিক লড়াইয়ে নেমেছেন। তদন্তে দায়ী ব্যক্তিদের নাম উঠে আসলে দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইনে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন এলাকাবাসী।
নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬
মন্তব্য করুন: