ডিএনএ সূত্রে শিকড় সিলেটে : ৭১ বছর পর বাবার খোঁজে ব্রিটিশ মার্টিন!
জন্ম লন্ডনে, বেড়ে ওঠা ব্রিটিশ পরিচয়ে। কিন্তু জীবনের ৭১টি বছর পার করার পরও মন থেকে মোছেনি একটিই প্রশ্ন—"কে আমার বাবা? কোথায় আমার শিকড়?" পিতৃপরিচয় খুঁজে পাওয়ার সেই দীর্ঘ ব্যাকুল অনুসন্ধানের সূত্র ধরে অবশেষে জন্মভূমির উত্তর মিলছে বাংলাদেশের সিলেটে। ডিএনএ টেস্ট ও রক্তভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের সূত্রে তাঁর অনুসন্ধান এসে ঠেকেছে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার মথিউরা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে।
কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় বসবাসরত ৭১ বছর বয়সী মার্টিন জোন্স সম্প্রতি তাঁর পিতৃপরিচয় উন্মোচনে সিলেটের প্রবাসী লেখক ও গবেষক ফারুক আহমদের সহযোগিতা চেয়েছেন। মার্টিনের বিশ্বাস, সংগৃহীত ডিএনএ ও পারিবারিক তথ্যের সূত্র ধরে খুব জলদিই হয়তো তিনি তাঁর রক্তের সম্পর্কের সন্ধান পাবেন।
জন্মসনদে নেই বাবার নাম
১৯৫৫ সালের ৩১ জানুয়ারি লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ হাসপাতালে জন্ম নেন মার্টিন। তাঁর মা ছিলেন একজন ইংরেজ নারী। তবে মার্টিনের জন্মসনদে বাবার নামের স্থানটি ছিল খালি। জীবনসায়াহ্নে এসে ২০২০ সালে তিনি ‘Ancestry’ ও ‘23andMe’ নামে দুটি ডিএনএ ও বংশপরিচয় সম্পর্কিত প্ল্যাটফর্মে নিজের তথ্য যুক্ত করে গবেষণা শুরু করেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানে ডিএনএর সঙ্গে মিলে যাওয়া মানুষদের শিকড় বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হন—তাঁর বাবা ছিলেন সিলেটেরই একজন সন্তান।
মার্টিনের ডিএনএর সঙ্গে সর্বাধিক মিল পাওয়া গেছে বিয়ানীবাজারের মথিউরা ইউনিয়নের দুধবকশী, মোল্লাগ্রাম, পশ্চিমপাড়, পূর্বপাড়, আওরঙ্গাবাদ ও দুয়াখা গ্রামের অধিবাসীদের। পাশাপাশি জালধুপ, বালিঙ্গা ও ভাদেশ্বর এলাকার সঙ্গেও কিছু যোগসূত্র রয়েছে।
ডিএনএ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে বসবাসকারী জাহানারা র্যালি (জন্ম-১৯৭৩) ও তাঁর ছেলে মোহাম্মদ রাজনের (জন্ম-১৯৯৪) সাথে মার্টিনের ডিএনএ মিল সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। ধারণা করা হচ্ছে, জাহানারা মার্টিনের সৎ ভাই বা বোনের মেয়ে হতে পারেন। এছাড়া যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী রমফোর্ডের তানিয়া মুহিত ও লন্ডনের ফাতিমা ফেরদৌসের সাথেও তাঁর সম্ভাব্য আত্মীয়তার সূত্র পাওয়া গেছে।
ডিএনএর মাধ্যমে জানা যায়, ১৯৫৫ সালের দিকে দুধবকশী গ্রামের বাসিন্দা এবং বিয়ানীবাজারের কিছু লোক লন্ডনের ফোর্ডহ্যাম স্ট্রিটে বসবাস করতেন। মার্টিনের ধারণা, তাঁর বাবা আনুমানিক ১৯১০ সালের দিকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ১৯৫৫ সালে তাঁর বয়স ছিল ৪০-এর কোটায়। মথিউরার পুরোনো চৌধুরী, খান, তালুকদার, মুহিত বা লোদী—এমন কোনো প্রখ্যাত পরিবারের সাথেই তাঁর যোগসূত্র থাকতে পারে।
সাত দশকের এই অনুসন্ধান স্রেফ একটি বংশলতিকা তৈরির চেষ্টা নয়, বরং নিজের অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়ার আকুলতা। গবেষক ফারুক আহমদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিজের এক সময়ের বাদামি চুল ও বর্তমানের ছবি পাঠিয়েছেন মার্টিন।
১৯৫০-এর দশকে ইংল্যান্ডে পাড়ি দেওয়া কোনো স্বজনের স্মৃতি, বংশলতিকা বা তথ্য যদি বিয়ানীবাজারের প্রবীণদের স্মৃতিতে থাকে, তবে তা মার্টিনের দীর্ঘ ৭১ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে পারে।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: