রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি
সিলেটের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নীরবতার কালি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে কালি দেওয়ার ঘটনা নিছক একটি ছবির ওপর কালি ছিটানো নয়; এটি একজন কবি, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে অপমান করার চেষ্টা। ঘটনার পর একজন রিকশাচালক এগিয়ে এসে ছবিটি পরিষ্কার করেছেন—এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে বড় মঞ্চ, দামি পোশাক কিংবা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের তকমা লাগে না; লাগে একটি বিবেক, একটি সাহসী মন।
অথচ প্রশ্ন হচ্ছে, সিলেটের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সেই পরিচিত মুখগুলো আজ বিলীন হয়ে গেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ পালনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে যারা সাংস্কৃতিক বাণিজ্য করেছে তাদের সবাই তো আর কালচারাল ফ্যাসিস্ট ছিলো না। তাদের অনেকেই এখন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছে! সুতরাং রবীন্দ্র ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদ আজ কোথায়?
ঢাকা প্রতিবাদ করছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীরা প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। আর সিলেটে? এখানে কি প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে গেছে? নাকি অনুষ্ঠান, উৎসব, সম্মাননা আর সুযোগ-সুবিধার হিসাবের বাইরে সংস্কৃতির পক্ষে দাঁড়ানোর সাহসটুকুও আজ আর অবশিষ্ট নেই?
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অনুষ্ঠান হলে মঞ্চ ভরে যায়, রবীন্দ্রসংগীতের আসর বসলে শিল্পীর অভাব হয় না, পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে আয়োজনের কমতি থাকে না—কিন্তু রবীন্দ্রনাথের অবমাননার প্রতিবাদে সেই কণ্ঠগুলো কোথায় হারিয়ে যায়?
সিলেটে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে শতবর্ষ উদযাপনের আয়োজন হয়েছে। কেউ পাঞ্জাবি-শাড়ি সরবরাহ করেছেন, কেউ শিল্পী জুগিয়েছেন, কেউ সাউন্ড সিস্টেম দিয়েছেন, কেউ অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে পরিচিতি ও প্রচার পেয়েছেন। তাঁদের সবার কাছে প্রশ্ন—সংস্কৃতি কি শুধু আয়োজনের নাম? সংস্কৃতি কি শুধু মঞ্চ, মাইক, পোশাক, ছবি আর করতালির হিসাব? সংস্কৃতির ওপর আঘাত এলে তার পক্ষে দাঁড়ানো কি আপনাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না?
রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে অনুষ্ঠান করে পরিচিতি অর্জন করা সহজ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রতি অসম্মানের প্রতিবাদে রাস্তায় দাঁড়ানোই বলে দেবে, আপনাদের সাংস্কৃতিক চর্চা কতটা আন্তরিক, আর কতটা কেবল অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক!
সিলেটের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নীরবতা আজ অস্বস্তিকর। যাঁরা নিজেদের সংস্কৃতির ধারক-বাহক বলে পরিচয় দেন, তাঁদের কাছে প্রশ্ন—আপনারা কি কেবল সুবিধাজনক সময়েই সংস্কৃতির কথা বলেন? প্রতিবাদে দাঁড়ালে যদি কারও বিরাগভাজন হতে হয়, তাহলে কি আপনাদের সাংস্কৃতিক চেতনা হঠাৎ করেই ছুটিতে চলে যায়?
জাতি আপনাদের কাছে জবাব চায়। সিলেটের মানুষ দেখতে চায়, সংস্কৃতির প্রশ্নে আপনারা সত্যিই কতটা আপসহীন।
সাহস নয়ে মাঠে নামুন। রবীন্দ্রনাথ তো কোনো দক বা গুস্টির নন। রবীন্দ্রসংগীত গাইতে আসুন প্রতিবাদ হিসেবে, আসুন সাংস্কৃতিক ময়দানে বা অন্তর্জালে , সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ জানাই এবং স্পষ্ট করে বলি—কোনো কবি, সাহিত্যিক কিংবা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের প্রতি বিদ্বেষমূলক অবমাননাকে আমরা সমর্থন করি না। একই সঙ্গে প্রতিবাদের নামে কোনো ব্যক্তির প্রতি অন্যায় আচরণ, সহিংসতা কিংবা আইনবহির্ভূত আচরণও সমর্থন করি না।
সিলেটের শিল্পী, সংগীতশিল্পী, আবৃত্তিকার, নাট্যকর্মী, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও সচেতন নাগরিকদের প্রতি আহ্বান—আপনারা সামনে আসুন। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে দায় শেষ করবেন না। শান্তিপূর্ণ, সম্মানজনক ও দৃশ্যমান প্রতিবাদে অংশ নিন।
আপনাদের একটি আন্তরিক আহ্বান পেলে অনেকেই উপস্থিত হতে প্রস্তুত। এখন প্রয়োজন উদ্যোগ, সাহস এবং সম্মিলিত অবস্থান। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও সম্মিলিত নাট্য পরিষদকে জেগে ওঠার সময় এখনই।
তবে সিলেটের সাংস্কৃতিক সমাজের কাছে শেষ প্রশ্ন—রবীন্দ্রনাথ কি শুধু আপনাদের মঞ্চের শিল্পী, নাকি আপনাদের সাংস্কৃতিক চেতনারও অংশ?
নীরবতা দিয়ে সব সময় নিরপেক্ষ থাকা যায় না। কখনো কখনো নীরবতাও মানুষের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
প্রতিবাদ হোক, কিন্তু প্রতিবাদ হোক সংস্কৃতির ভাষায়। কণ্ঠ উঠুক, মানুষ জাগুক, সিলেট তার সাংস্কৃতিক দায়িত্ব পালন করুক। সকল সাংস্কৃতিক কর্মীর প্রতি দৃঢ় আহ্বান—আসুন, ঐক্যবদ্ধ হই, প্রতিবাদে শামিল হই এবং সাংস্কৃতিক অবমাননার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করি। এই আহ্বান কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে হুমকি নয়; এটি বিবেক, দায়িত্ব ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: