সামরিক স্বৈরশাসন থেকে গণতন্ত্রের উত্তরণে শহীদ নাজির উদ্দিন জেহাদ

একটি অবিনাশী ইতিহাস

সামরিক স্বৈরশাসন থেকে গণতন্ত্রের উত্তরণে শহীদ নাজির উদ্দিন জেহাদ

সালেহ আহমদ

০৯/১০/২০২৬ ২২:৪৭:৫২

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

১৯৮২ থেকে ১৯৯০—বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসে এক অন্ধকার ও উত্তাল অধ্যায়। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এক রক্তপাতহীন কিন্তু অসাংবিধানিক সামরিক অভ্যুথানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ। সংবিধান স্থগিত, বাকস্বাধীনতা হরণ, বিচারবিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ এবং বিরোধী দলমতকে চরম নির্দয়ভাবে দমনের মধ্য দিয়ে দেশ এক দীর্ঘ সামরিক স্বৈরশাসনের কবলে পড়ে। সেসময় নির্বাচনব্যবস্থাকে প্রহসনে পরিণত করে নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার যে চক্রান্ত শুরু হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের ছাত্রসমাজ।


সামরিক স্বৈরাচারের সেই দুঃশাসনের পটভূমিতে দীর্ঘ নয় বছর ধরে এদেশের ছাত্রসমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলো রক্তক্ষয়ী রাজপথের সংগ্রাম চালিয়ে যায়। সামরিক জান্তার উৎখাত এবং গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ১৫ দল (পরবর্তীতে ৮ দল), ৭ দল ও ৫ দলের সমন্বয়ে ঐতিহাসিক জোট গঠিত হয়। রাজপথের এই দীর্ঘ ও আপসহীন লড়াইয়ের এক চূড়ান্ত মোড় ছিল ১৯৯০ সালের অক্টোবর মাস।


১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর। তিন রাজনৈতিক জোটের কেন্দ্রবিন্দু—রাজধানীর মতিঝিল ও পল্টন এলাকায় সর্বাত্মক 'ঢাকা অবরোধ' কর্মসূচি বাস্তবায়নে রাজপথে নেমে আসে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। রাজপথ তখন প্রতিবাদী মিছিলে উত্তাল। স্বৈরাচারের পুলিশ বাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর নির্মম ছররা গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। ঠিক সেই মুহূর্তে স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অকুতোভয় নেতা নাজির উদ্দিন জেহাদ নিজের বুক পেতে দেন। মতিঝিল-পল্টনের মাঝামাঝি স্থানে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন জেহাদ।


শহীদ নাজির উদ্দিন জেহাদের এই আত্মত্যাগ হঠাৎ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; বরং তা ছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের দীর্ঘ শহীদ তালিকায় এক নতুন অগ্নিশিখা। শাহজাহান সিরাজ, সেলিম-দেলোয়ার, রাউফুন বসুনিয়া, তাজুল, আসলাম, জামিল আকতার কিংবা নূর হোসেনের মতো নাম জানা-অজানা শত শত শহীদের আত্মদানের ধারায় যুক্ত হয় জেহাদের নাম।


১০ অক্টোবর বিকেলেই জেহাদের রক্তাক্ত লাশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে আনা হলে গোটা ক্যাম্পাস এক অগ্নিগর্ভ রূপ নেয়। সামরিক জান্তার পতন না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ না ছাড়ার বজ্রকঠিন হুঙ্কার ওঠে সেখান থেকে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে শহীদ জেহাদের মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে সেদিন সামরিক স্বৈরাচারের চূড়ান্ত উৎখাতের শপথ নেন তৎকালীন ক্রিয়াশীল সর্বস্তরের ছাত্রনেতারা।


এই ঐতিহাসিক শপথের মধ্য দিয়েই আত্মপ্রকাশ করে ২৪টি ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের শক্ত মোর্চা—'সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য'। সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতৃত্বে ছাত্র আন্দোলন এক লড়াকু গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। পরবর্তীতে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের পেশাজীবী সমাজ এই আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করলে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার সম্পূর্ণ অচল ও দিশেহারা হয়ে পড়ে।


সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের আপসহীন আন্দোলন এবং সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক জোটের সমন্বিত গণঅভ্যুত্থানের তীব্র মুখে টিকতে না পেরে ৪ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। অবশেষে ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক হস্তান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশে দীর্ঘ কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রে উত্তরণের সোপান উন্মোচিত হয়।


আজ শহীদ জেহাদ দিবসে আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি সেই মহান শহীদকে, যার তাজা রক্ত আমাদের একটি গণতান্ত্রিক ভোরের মুখ দেখিয়েছিল। তবে ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, স্বৈরাচারের পতন হলেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এক নিরন্তর প্রক্রিয়া। তাই শহীদ জেহাদের স্মৃতি আমাদের আজও যেকোনো অন্যায় ও স্বৈরাচারী মনোভাবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে এবং দেশে প্রকৃত ও অর্থপূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অনুপ্রেরণা যোগায়।


লেখক

সালেহ আহমেদ,  সাবেক ছাত্র নেতা, বাংলাদেশ ছাত্র ঐক্য সমিতি ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য  ১৯৯০

নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad