প্রাথমিক শিক্ষক: জাতি গঠনের কারিগর

প্রাথমিক শিক্ষক: জাতি গঠনের কারিগর

বশির আহমদ জুয়েল

০৫/১০/২০২৬ ২৩:৩৯:৪৫

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়—প্রতিটি স্তরেরই নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। তবে একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো প্রাথমিক শিক্ষা। আর সেই ভিত্তি নির্মাণের মহান দায়িত্ব যাঁদের হাতে অর্পিত, তাঁরা হলেন আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ। প্রাথমিক শিক্ষাকে যথার্থই বলা যায় শিক্ষার শিকড়।


একটি গাছ যত বড়ই হোক, তার শক্তি ও স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার শিকড় কতটা গভীরে এবং কতটা মজবুত তার ওপর। শিক্ষাজীবনও তেমনই। প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি যদি দুর্বল হয়, পরবর্তী শিক্ষার স্তরগুলো অনেক সময়ই একজন শিক্ষার্থীর কাছে অর্থবহ হয়ে ওঠে না। আর সেই ভিত্তি নির্মাণে ব্যর্থতা শুধু একজন শিক্ষার্থীর নয়, একজন প্রাথমিক শিক্ষকেরও ব্যর্থতা।


সম্প্রতি নানা আলোচনা-সমালোচনা ও প্রতীক্ষার পর যারা সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের সবাইকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।


আমি বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁদের শুধু একটি কথা মনে করিয়ে দিতে চাই—আজ যারা শিক্ষক হয়েছেন, তাঁরা একবার নিজেদের শৈশবের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিনগুলোর কথা স্মরণ করুন। মনে করুন সেই শ্রেণিকক্ষ, সেই শিক্ষক এবং সেই সময়ের কথা, যখন আপনারাও একজন শিশুশিক্ষার্থী ছিলেন। যে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন না করলে আজ আপনারা শিক্ষক হওয়ার সুযোগই পেতেন না।


সুতরাং, আপনারা যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, তা নিছক একটি চাকরি নয়। এটি একটি মহৎ পেশা, একটি নৈতিক অঙ্গীকার এবং জাতি গঠনের বিশাল দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের কোনো বিকল্প নেই।


মনে রাখতে হবে, একজন শিশুর জীবনে প্রাথমিক শিক্ষক শুধু একজন শিক্ষক নন; তিনি শিশুর প্রথম শিক্ষাগুরু, পথপ্রদর্শক এবং আদর্শ মানুষ হয়ে ওঠার অন্যতম প্রধান কারিগর। একটি শিশু বিদ্যালয়ে এসে প্রথম যে শিক্ষককে দেখে, তাঁর আচরণ, কথা, মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও ভালোবাসা শিশুর মনে গভীর ছাপ ফেলে।


তাই বলা যায়, শিক্ষার শিকড় যত গভীর হয়, ভবিষ্যতের জ্ঞান ও চরিত্রের বৃক্ষ তত শক্তিশালী হয়। আর সেই শিকড়কে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর প্রথম দায়িত্ব একজন প্রাথমিক শিক্ষকের।


আপনারা একটি চাকরিতে যোগদান করেননি; আপনারা এমন একটি মহান পেশায় প্রবেশ করেছেন, যার মাধ্যমে একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছেন। আপনাদের একটি ভালো কথা কোনো শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিতে পারে, আপনাদের একটি উৎসাহ তার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। আবার আপনাদের অবহেলা কিংবা নেতিবাচক আচরণ একটি কোমল মনকে পিছিয়ে দিতে পারে।


আপনাদের দায়িত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা নয়। আপনাদের দায়িত্ব হলো শিশুর মধ্যে সততা, মানবিকতা, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও আত্মবিশ্বাসের বীজ বপন করা।


একজন শিক্ষার্থী হয়তো একদিন ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক, প্রশাসক, বিজ্ঞানী কিংবা দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক হবে। কিন্তু তার সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রথম হাতটি হতে পারে আপনাদেরই হাত।


তাই এই মহান দায়িত্ব গর্বের সঙ্গে, ভালোবাসার সঙ্গে এবং গভীর দায়িত্ববোধ নিয়ে পালন করতে হবে। প্রতিটি শিশুকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতে হবে। তার মেধা, আগ্রহ ও সম্ভাবনাকে চিনতে হবে এবং তাকে তার স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগাতে হবে।


মনে রাখতে হবে—একজন প্রাথমিক শিক্ষক শুধু একটি শ্রেণিকক্ষের কয়েকজন শিশুকে শিক্ষা দেন না; তিনি ভবিষ্যতের একটি সমাজ, একটি প্রজন্ম এবং একটি জাতিকে গড়ে তোলার কাজে অংশ নেন।


একজন শিক্ষার্থী সারাজীবন তার শিক্ষককে শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রাখে—এমন দৃষ্টান্ত আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই কমবেশি রয়েছে। একজন শিক্ষকের প্রকৃত সাফল্য হয়তো তাঁর কর্মজীবনের পদ-পদবি কিংবা অর্জনে নয়; বরং কতজন শিক্ষার্থীর হৃদয়ে তিনি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আসন করে নিতে পেরেছেন, তার মধ্যেই নিহিত।


আমিও আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শ্রী জয়কুমার চন্দ্র সরকারকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তরং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা ও স্নেহ আজও আমার হৃদয়ে অমলিন। স্যারের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভক্তি আজও অন্তহীন। সময় পেরিয়ে যায়, শিক্ষাজীবনের বহু অধ্যায় শেষ হয়ে যায়, কিন্তু একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রভাব কখনো শেষ হয় না—তিনি তাঁর শিক্ষার্থীর চিন্তা, চরিত্র ও স্মৃতির ভেতর আজীবন বেঁচে থাকেন।


আপনাদের হাতেই গড়ে উঠবে আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাই শিক্ষকতা শুধু জীবিকা নয়—এটি একটি মহৎ দায়িত্ব, একটি নৈতিক অঙ্গীকার এবং জাতি গঠনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুযোগ।


নবনিযুক্ত সকল সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকাকে আবারও জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। আপনাদের জ্ঞান, মমতা, সততা, নিষ্ঠা ও আদর্শে প্রতিটি শিশু আলোকিত হোক—এটাই হোক আপনাদের শিক্ষকজীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।


আমি বিশ্বাস করি—“একজন ভালো শিক্ষক একটি শিশুর জীবন বদলে দিতে পারেন; আর অসংখ্য ভালো শিক্ষক একটি জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারেন।”

লেখক:

বশির আহমদ জুয়েল, সাহিত্যিক ও সম্পাদক

নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad