বিষাদের দলিল সিলেটের এক প্রবাদ
‘লংলা গাঁইয়া বেটি গো’
“উঁচাত বান্ধো খোঁপা, হাইর গলাত ছিয়া ফালাইয়া দেশো রাখছো খোঁটা”—সিলেট অঞ্চলে এখনো মুখে মুখে ফেরে এই লোকপ্রবাদ। এক লাইনের এই ছড়ার আড়ালে লুকিয়ে আছে প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো এক ট্র্যাজিক কাহিনি—ভালোবাসা, ক্ষমতা, বিশ্বাসভঙ্গ আর করুণ পরিণতির ইতিহাস।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার লংলা পরগণাকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র করিমুন্নেসা, যিনি আজও ইতিহাসে এক বিতর্কিত ও রহস্যময় নাম।
জমিদার কন্যার জীবন থেকে অন্ধকার ইতিহাস
লংলা পরগণার প্রভাবশালী জমিদার নজম্বর আলী চৌধুরীর কন্যা ছিলেন করিমুন্নেসা। রূপে-গুণে অনন্য এই জমিদার তনয়া ছিলেন অন্যদের চেয়ে আলাদা—প্রজাদের দুঃখ-কষ্টে তিনি ছিলেন সংবেদনশীল। কিন্তু সেই শান্ত, সংবেদনশীল জীবনই একসময় প্রবেশ করে এক নিষিদ্ধ প্রেমের ঘূর্ণিপাকে।
বাবার সেরেস্তাদারের কাছে পড়াশোনা করতে গিয়ে ধীরে ধীরে এক আবেগঘন সম্পর্ক গড়ে ওঠে—যা পরবর্তীতে সামাজিক আভিজাত্য ও বাস্তবতার দেয়ালে আটকে যায়।
বিয়ে, একাকিত্ব ও নিষিদ্ধ টান
পরবর্তীতে করিমুন্নেসার বিয়ে হয় ইটা রাজ্যের (বর্তমান রাজনগর উপজেলার মনসুরনগর) জমিদার দেওয়ান মো. মনসুর ওরফে কটু মিয়ার সঙ্গে। কিন্তু প্রাচুর্যের ভেতরেও তার জীবনে নেমে আসে একাকিত্ব।
শোনা যায়, স্বামীর ব্যস্ততা ও অবহেলায় তিনি মানসিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে পুরনো সম্পর্ক ও অনুভূতির টান তাকে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দেয়।
রহস্যময় মৃত্যু ও ছড়িয়ে পড়া গুঞ্জন
১৮৭০ সালের এক রাতে কটু মিয়ার রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। লোকমুখে প্রচলিত আছে, শিল-নোড়া বা লাঠি দিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয়। আবার কারও মতে, বিষ মিশিয়ে দেওয়া হয় খাবারে।
ঘটনার পর পুরো লংলা অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক ও ক্ষোভ। জনশ্রুতি রয়েছে, এই ঘটনায় করিমুন্নেসার ওপর চরম নির্যাতন চালানো হয়—যা সময়ের সঙ্গে লোককথায় রূপ নেয়।
পলাতক জীবন ও আদালতের রায়
ঘটনার পর করিমুন্নেসা আত্মগোপনে চলে যান। ব্রিটিশ প্রশাসন তাকে ধরতে পুরস্কার ঘোষণা করলেও দীর্ঘদিন তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে ছদ্মবেশে থাকা এক তদন্ত কর্মকর্তার কাছে তিনি আত্মসমর্পণ করেন বলে প্রচলিত রয়েছে। আদালতে তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ স্বীকার করেন এবং মামলার রায়ে তার ফাঁসির আদেশ হয়।
সিলেটের ইতিহাসে এটি এক আলোচিত ও বিরল বিচারিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়—যেখানে একসঙ্গে একাধিক আসামির দণ্ড কার্যকর হয়েছিল বলে কথিত আছে।
ইতিহাস নাকি লোককথা?
ফাঁসির পর তার মরদেহ গ্রহণে কেউ এগিয়ে আসেনি—এমন কথাও লোকমুখে প্রচলিত। পরে তাকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় বলে শোনা যায়।
তবে ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করেন, এই কাহিনির অনেক অংশই লোককথা ও প্রজন্মান্তরে পরিবর্তিত বর্ণনার মিশ্রণ।
প্রবাদে বন্দি এক নারীর গল্প
আজও সিলেট অঞ্চলে লংলার নারীদের নিয়ে ব্যবহৃত হয় সেই পুরোনো প্রবাদটি। কিন্তু করিমুন্নেসার গল্প কেবল অপরাধ বা কলঙ্কের নয়—এটি এক আভিজাত্যবন্দি নারীর আবেগ, সমাজচাপ, প্রেম ও পরিণতির এক জটিল মানবিক দলিল।
ইতিহাস তাকে যেমনভাবে উপস্থাপন করেছে, তেমনি লোককথাও তাকে ঘিরে তৈরি করেছে রহস্যের স্তর। আর সেই স্তরের মাঝেই আজও বেঁচে আছে “লংলা গাঁইয়া বেটি গো”—এক বিষাদের প্রতিধ্বনি।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: