অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই

ঢাকা অফিস

০৫/০৭/২০২৬ ১৮:১৫:২৯

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন লেখক ও গবেষক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) 

 রোববার (৫ জুলাই)  দুপুরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর মিরপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। 

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ও অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের সরাসরি ছাত্র মোহাম্মদ আজম মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।  গুণী এই চিন্তাবিদের প্রয়াণে দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের জন্ম ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চরপাকুন্দিয়া গ্রামে।  তিনি ১৯৫৯ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা এবং ১৯৬১ সালে আনন্দ মোহন কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন।  পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৬৫ সালে স্নাতক ও ১৯৬৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।  

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি মুনীর চৌধুরী, আহমদ শরীফ ও নীলিমা ইব্রাহিমের মতো প্রথিতযশা শিক্ষাবিদদের সান্নিধ্যে আসেন এবং প্রগতিশীল ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হন। কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন এবং বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবেও অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। 

২০২৪ সালের অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে তিন বছরের জন্য বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়।  আজীবন প্রগতিশীল রাজনীতির সমর্থক এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চার পুরোধা এই ব্যক্তিত্ব সর্বস্তরে বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষা কমিটি’র আহ্বায়ক হিসেবে রাজপথে ও লেখনীর মাধ্যমে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন।

দীর্ঘ মননশীল সাহিত্যজীবনে তিনি ২০টিরও বেশি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেছেন।  তাঁর রচিত ‘মুক্তির সংগ্রাম’, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’, ‘রাজনীতি ও দর্শন’, ‘সাহিত্য চিন্তা’ এবং ‘সংস্কৃতির সহজ কথা’ বইগুলো এ দেশের প্রগতিশীল চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে। 

১৯৮১ সালে প্রবন্ধ ও গবেষণায় অনন্য অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন।  এই মহান শিক্ষাবিদের ব্যক্তিগত জীবনও ছিল এক গভীর ট্র্যাজেডিতে ভরা।  ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর তাঁর একমাত্র পুত্র এবং প্রগতিশীল প্রকাশনা সংস্থা ‘জাগৃতি প্রকাশনী’র স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপন শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে উগ্রপন্থীদের নির্মম হামলায় নিহত হন।  পুত্র হত্যার পরও অধ্যাপক ফজলুল হক চরম ধৈর্য, সততা ও সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন।  তিনি দেশে প্রতিশোধের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও সামাজিক অবক্ষয় দূর করে সুস্থ সমাজ প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিয়েছিলেন, যা তৎকালীন সময়ে পুরো জাতিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের আকস্মিক প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মহলে শোকের ঢল নেমেছে।  তাঁর মৃত্যুতে গভীর দুঃখ ও শোক প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা।  শোকবার্তায় তাঁরা বলেছেন, অধ্যাপক ফজলুল হকের মতো একজন আপসহীন ও নির্মোহ চিন্তাবিদের চলে যাওয়া দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্ররা গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছেন, অধ্যাপক ফজলুল হক কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবেক ও প্রগতির বাতিঘর। ক্লাসরুমের ভেতরে ও বাইরে তিনি যেভাবে সত্য বলতে শিখিয়েছেন এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চা করিয়েছেন, তা নতুন প্রজন্মের শিক্ষকদের জন্য আজীবন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। 

সজল আহমেদ

মন্তব্য করুন: