মেলা আয়োজনের পক্ষে-বিপক্ষে স্মারকলিপি, তোলপাড় সিলেট!
সিলেটের ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ খেলার মাঠে আগামী ১০ অক্টোবর থেকে ঘোষিত মাসব্যাপী “সৃজনশীল পণ্য প্রদর্শনী, শিল্প-পণ্য ও বাণিজ্য মেলা” আয়োজনকে কেন্দ্র করে সিলেটের স্থানীয় ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক ও উত্তাপ সৃষ্টি হয়েছে। মেলার পক্ষে ও বিপক্ষে দুই পক্ষই জেলা প্রশাসকের (ডিসি) দ্বারস্থ হওয়ায় পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে মুখোমুখি।
একদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো মেলা বন্ধের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলা ও সিলেট জেলা ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের নেতৃবৃন্দ গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় সিলেট সার্কিট হাউসে জেলা প্রশাসকের কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন।
স্মারকলিপিতে ব্যবসায়ীরা উল্লেখ করেন, বিগত তিন বছর যাবত বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তারা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় ব্যবসায়ীরা যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন, তখন এ ধরণের সাময়িক মেলা স্থায়ী ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নামাবে। এছাড়া খেলাধুলার পরিবেশ বিনাশ, উদীয়মান ক্রীড়াবিদদের শারীরিক-মানসিক বিকাশ ব্যাহত হওয়া, আগামী নভেম্বরে শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত এবং স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহে অতিরিক্ত চাপের বিষয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা, পরিবেশ উন্নয়ন ও শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে মেলাটি অনতিবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানান তারা। পাশাপাশি তারা জানান, সিলেটের সর্বস্তরের ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন চেম্বারকে সাথে নিয়ে যৌথভাবে সিলেটে একটি মাত্র একক বাণিজ্য মেলার আয়োজন করা যেতে পারে।
স্মারকলিপি প্রদানকালে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলার মহাসচিব ও সিলেট জেলা ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান রিপন, সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আতিকুর রহমান, শাহ আহমদুর রব, নুরুল ইসলাম সুমন, সাধারণ সম্পাদক মো: আব্দুল আহাদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মো: লায়েক মিয়া, সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আলী আকিক, মোঃ মনিরুল ইসলাম, ফুয়াদ বিন রশিদ, সাংগঠনিক সম্পাদক নিয়াজ মো: আজিজুল করিম, সিটি সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো: আতাউর রহমান রজব, ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শোয়েব আহমদ অভি, মধুবন সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনজুর আহমদ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ইনামুল করিম চৌধুরী, সিলেট জেলা ফুল ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি রাসেল আলী, শুকরিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রূপন খান, বৃহত্তর শিবগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদুজ্জামান চৌধুরী ও মোতালেব ভিলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মাওলানা ফিরোজ উদ্দিনসহ অন্যান্য ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান 'সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি'-র নেতৃবৃন্দ ও সিলেটের সকল নারী উদ্যোক্তারা মেলার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে একাট্টা হয়েছেন। তারা জানান, সিলেটে গত তিন বছর ধরে কোনো মেলা অনুষ্ঠিত হয়নি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত ক্যালেন্ডার এবং সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নারী উদ্যোক্তাদের বাণিজ্যিক প্রসার, নিজেদের তৈরি পণ্য প্রদর্শন এবং দেশব্যাপী উদ্যোক্তাদের মধ্যে পারস্পরিক মেলবন্ধন সৃষ্টির লক্ষ্যে এ প্রদর্শনী আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উইমেন চেম্বার নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখতে নারী উদ্যোক্তারা নিরলস কাজ করে গেলেও একটি মহল পরিকল্পিতভাবে সিলেটে তাদের দমিয়ে রাখার চক্রান্তে লিপ্ত। এর ফলে নারী উদ্যোক্তাদের অস্তিত্ব আজ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তারা জানান, তৃণমূল থেকে শুরু করে শহরের প্রতিটি নারী উদ্যোক্তাকে এক ছাতার নিচে এনে ঐক্যের শক্ত বার্তা পৌঁছাতেই তারা মাঠে নেমেছেন। অধিকার আদায়ে প্রয়োজনে সিলেটের রাজপথে কঠোর কর্মসূচীতে নামার হুঁশিয়ারিও দেন তারা।
আয়োজকরা জোর দিয়ে বলেন, আগামী ১০ অক্টোবরের এই মেলা কেবল কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, বরং এটি নারী উদ্যোক্তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর এবং নিজেদের স্বাবলম্বী প্রমাণ করার একটি বড় প্ল্যাটফর্ম। মেলাটির মাধ্যমে তৃণমূলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তারা তাদের হাতে তৈরি সৃজনশীল পণ্য, ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প ও বুটিক্স পণ্য সরাসরি বিক্রি ও বাজারজাতকরণের অনন্য সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি বড় ব্যবসায়ী, পাইকারি ক্রেতা ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সাথে নেটওয়ার্ক তৈরি এবং নিজেদের ব্র্যান্ড পরিচয়ের পথ সুগম হবে, যা প্রতিকূল পরিবেশ কাটিয়ে তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখবে।
মেলা বন্ধের চেষ্টার বিপরীতে এবং মেলা সফল করার লক্ষ্যে সিলেটের সর্বস্তরের নারী উদ্যোক্তাদের একযোগে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আজ মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টায় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে পাল্টা স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে উইমেন চেম্বার।
নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬
মন্তব্য করুন: