যোগ্যতা প্রমাণ করেও সুনামগঞ্জে বঞ্চিত হলেন ১২০ শিক্ষক
সব পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে যিনি ভেবেছিলেন তিনি এখন একঝাঁক শিশুর শিক্ষক, তার মনে আজ চরম হতাশা আর অনিশ্চয়তার কালো ছায়া। সুনামগঞ্জে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত ১২০ জন প্রার্থীর জীবন আজ এক অজানা শঙ্কায় ঝুলছে। দীর্ঘ আট মাসের স্বপ্ন, প্রস্তুতি আর পরিবারের আশা এক নিমেষেই ফিকে হয়ে গেছে নিয়োগ তালিকার রহস্যজনক পরিবর্তনে। নিজেদের এই আক্ষেপ ও আকুতি জানাতে শনিবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের বাসভবনের সামনে এসে অবস্থান নেন ভুক্তভোগী প্রার্থীরা।
লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার দীর্ঘ ধাপ পেরিয়ে ৬১৭ জনের চূড়ান্ত তালিকায় নিজেদের স্থান নিশ্চিত করেছিলেন এই তরুণ-তরুণীরা। তারা যখন যোগদানের প্রহর গুনছিলেন, মিষ্টি বিতরণ আর অভিনন্দনের মধ্য দিয়ে পরিবারগুলো স্বপ্ন বুনছিল এক সুন্দর ভবিষ্যতের, তখনই আঘাতটি আসে। প্রকাশিত যোগদান তালিকায় নাম নেই মেধাক্রমের সামনের দিকে থাকা এই ১২০ জনের। কেন তারা বাদ পড়লেন, সে প্রশ্নের কোনো জবাব নেই কারও কাছে। কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ নেই, নেই কাগজপত্র সংক্রান্ত জটিলতা—তবুও কোনো অস্পষ্ট কারণে থমকে গেছে তাদের স্বপ্ন।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার গোপালপুর গ্রামের অসীম কুমার দাসের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসছিল মানবেতর এই পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে, "আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে চাকরিটা হয়েছে। যোগদানের প্রস্তুতিও নেওয়া শেষ। কিন্তু হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই আমাদের নাম বাদ দেওয়া হলো। আমরা এখন কী করব, কার দুয়ারে যাব? আমরা তো মানসিকভাবে একদম ভেঙে পড়েছি, আমাদের বাবা-মা আর স্বজনেরাও আজ বাকরুদ্ধ।"
একই আকুতি বিশ্বম্ভরপুরের মো. আশরাফুল আলমের। হাহাকার ভরা কণ্ঠে তিনি বলেন, "কোনো কারণ ছাড়া এভাবে স্বপ্নের দুয়ার বন্ধ হয়ে গেলে মানুষের মানসিক ভারসাম্য ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বহু পরিবার আজ চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছে। আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে মানবিক দৃষ্টি আশা করছি।"
জগন্নাথপুরের মো. আরিফ উদ্দিনের বক্তব্যে ফুটে উঠল দীর্ঘ প্রতীক্ষার যন্ত্রণা, "দীর্ঘ ৮টা মাস ধরে একটা দিনের আশায় প্রহর গুনেছি। শেষ মুহূর্তে এসে অন্যায়ভাবে আমাদের স্বপ্নকে থামিয়ে দেওয়া হলো। আমরা কেবল আমাদের ন্যায্য অধিকার ও নিয়োগ চাই।"
দুপুরে প্রার্থীরা তাঁদের করুণ আকুতি জানাতে জেলা শিক্ষক নিয়োগ কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসকের কাছে যান। তবে তাঁকে না পেয়ে তারা বাসভবনের সামনেই নিজেদের দাবি নিয়ে অবস্থান নেন। পরবর্তীতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনার আশ্বাস দিলে প্রার্থীরা বিষণ্ন মনে আপাতত স্থান ত্যাগ করেন।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাস প্রথম সিলেটকে জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এই ১২০ জনের যোগদানপত্র আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
পরীক্ষায় পাস করে, সরকারি তালিকায় নাম তুলে যারা নিজ নিজ পরিবারকে একটু গুছিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জটিলতায় তারা আজ দিকবিদিকশূন্য। এখন কেবলই দেখার বিষয়—অনভিপ্রেত এই জটিলতার দ্রুত নিরসন ঘটিয়ে কর্তৃপক্ষ এই ১২০টি পরিবার ও তাদের তরুণ মুখগুলোতে হাসির রেখা ফেরাতে পারে কি না।
লতিফুর রহমান রাজু/ নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬
মন্তব্য করুন: