বার্মিংহামের বুকে মারেফতি মজমায় অসাম্প্রদায়িক শেকড়ের টান

বার্মিংহামের বুকে মারেফতি মজমায় অসাম্প্রদায়িক শেকড়ের টান

ইফতেখারুল হক পপলু , বার্মিংহাম থেকে

২৩/০৯/২০২৬ ১৩:৫০:৫৭

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

পরবাসের যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল পেরিয়ে গত রোববার দুপুরে বার্মিংহামের স্মল হিথ যেন কিছুক্ষণের জন্য রূপ নিয়েছিল রূপসী বাংলার এক মায়াময় প্রাঙ্গণে। পূর্বনাট স্টুডিওর হলরুমে আয়োজিত ‘মারেফতি মজমা’ কেবল কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়ে থাকেনি; তা হয়ে উঠেছিল ফেলে আসা শৈশব, আত্মিক শেকড় আর আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক আকুল ব্যাকুল মিলনমেলা। ‘কালচারাল অ্যাকশন এরিয়া অফ স্মলহীথ’-এর উদ্যোগে, সৃজনশীল সংগঠন ‘পূর্বনাট’ ও ‘সিলেট টাউন ক্লাব’-এর যৌথ প্রাতিষ্ঠানিক ভালোবাসায় জমে উঠেছিল এই মরমী জলসা।


অনুষ্ঠানের শুরুতেই উপস্থিত বহু ভাষাভাষী ও নানা প্রজন্মের মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে যায় এক অলৌকিক নস্টালজিয়া। সিলেটের হজরত শাহজালাল (র.)-এর দরগাহের ওরসের চিরচেনা ঐতিহ্যের আদলে লাল সামিয়ানা টাঙিয়ে, তুষা শিন্নি হাতে সুফি গানের সুরে সুশোভিত হয়ে প্রবেশ করেন আয়োজকরা। বড় ডেকচিতে ফুটতে থাকা শিন্নি ও আখনি পরিবেশনের অপেক্ষা, বাতাসার সেই চেনা সুবাস আর ফকিরি-মুর্শিদি গানের সুর—সব মিলিয়ে প্রবাসের যান্ত্রিক বাতাসকে একনিমেষে ভুলিয়ে সেখানে জাগ্রত হয়েছিল গ্রামবাংলার এক চেনা আবেশ। বর্ণ-ধর্ম-সংগতির ঊর্ধ্বে উঠে সবাই যখন এক থালায় শিন্নি ভাগ করে খাচ্ছিলেন, তখন সেখানে মূর্ত হয়ে ওঠে হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক বাংলার চিরায়ত বন্ধন ও পরম আপনত্ব।


পূর্বনাটের পরিচালক মুরাদ খান ও সিলেট টাউন ক্লাবের সংগঠক শাকিল আহমেদের যৌথ ও প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় আয়োজিত এই জলসায় উঠে আসে শেকড় সন্ধানের তীব্র ব্যাকুলতা। মুরাদ খান গভীর আবেগ নিয়ে জানান, এই মারেফতি মজমা প্রবাসীদের কাছে কেবল গান আর খাবারের আয়োজন নয়; এটি পারিবারিক স্মৃতি, নিজের সত্তা ও সংস্কৃতিকে নতুন করে আবিষ্কার করার এক মায়াবী মাধ্যম। সিলেট টাউন ক্লাবের অন্যতম উদ্যোক্তা জেবতিক রাজীব হক বলেন, স্বদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে অবস্থান করেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে আমাদের ঐতিহ্যের এই অমলিন সুর তুলে দেওয়ার জন্যই আমাদের এই নিরন্তর প্রয়াস।


সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণ পর্বে প্রবীণ ও বিদগ্ধজনেরা সিলেটের ওরস, সুফি ভাবধারা এবং বাংলার মরমী ঐতিহ্যের সোনালী দিনগুলো নিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। আলোচনায় অংশ নেন গোলাম মোস্তফা চৌধুরী যুবরাজ, কাউন্সিলর জালাল উদ্দিন, নোমান আল মনসুর, নাসির উদ্দিন হেলাল, ওবায়দুল হাসান লোদী, আফসানা সালাম, তানজিনা হোসাইনসহ অনেকে। তাঁরা প্রবাসের বুকে এই মরমী পথচলা অব্যাহত রাখার আকুল আহ্বান জানান।


বিকেলের দিকে যখন সুরের জলসা জমল, তখন যেন মুছে গেল সব পার্থক্যের দেয়াল। বাউল ইকরাম উদ্দিনের কণ্ঠে যখন বেজে উঠল "বাবা শাহজালালের দেশ", কিংবা রোজী সরকারের দরদী গলায় লালন সাঁইজির সাধুসঙ্গের গান—তখন উপস্থিত সবাই একাত্ম হয়ে যান এক পরম অখণ্ডতায়। সুফি সংগীতের পাশাপাশি হাসন রাজা, লালন শাহ এবং কীর্তনের সুর মিলেমিশে একাকার হয়ে সৃষ্টি করে ভালোবাসার এক অপার অসাম্প্রদায়িক আবহ।


দিনশেষে, মনের গহীনে একবুক ভালোলাগা ও স্মৃতির মায়াজাল জড়িয়ে নিভৃত জীবনসংগ্রামে ফিরে যান বিলেতের প্রবাসীরা। তবে যাওয়ার আগে রেখে যান এক সমবেত প্রার্থনা—দেশমাতার ওপর নেমে আসা সকল অশুভের বিনাশ হোক, আর আবহমান বাংলার মাটি ও মানুষের মাঝে অমর হয়ে থাকুক শান্তি, সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যের এই সুর।

নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad